সম্পাদকীয় ১...
পত্রপাঠ
ইন আকাশ হইতে পড়ে না, তাহার পিছনে থাকে ধারণা, বিশ্বাস, মানসিকতা। প্রতিটিই কালনির্ভর। উনিশ শতকের মধ্যপর্বে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা যখন জারি হয়, তখন ব্রিটিশ নীতিকাররা যৌন আচরণ সম্পর্কে এক ধরনের মানসিকতা, বিশ্বাস এবং ধারণার বশবর্তী ছিলেন। সেই অনুসারে তাঁহারা আপন দেশের আইন রচনা করিয়াছিলেন। ‘অসভ্য’ ভারতকে ‘সভ্য’ বানাইবার মহান দায়িত্ব পালনের তাগিদে তাঁহারা এই দেশের জন্যও তদনুসারী আইন প্রবর্তন করিয়াছিলেন। সার্ধশতবর্ষ কাটিয়া গিয়াছে। ইতিমধ্যে দেশ স্বাধীন হইয়াছে। ব্রিটিশ আইনপ্রণেতারা স্বদেশে যৌন আচরণ সম্পর্কিত অনুরূপ আইনটি রদ করিয়াছেন, তাহার পরেও প্রায় অর্ধ শতাব্দী অতিক্রান্ত। কিন্তু সনাতন ভারত কিছুই ছাড়িতে পারে না, সুতরাং এখনও সে ওই সম্পূর্ণ নির্বোধ এবং অন্যায় আইনটি ধরিয়া রাখিয়াছে। এমনকী চার বত্‌সর পূর্বে দিল্লি হাইকোর্ট আইনটি সংশোধনের পরামর্শ দেওয়ার পরেও এ বিষয়ে কার্যত কিছুই করে নাই। এখন সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরে শোরগোল শুরু হওয়ায় ঈষত্‌ নড়াচড়া হইতেছে বটে, কিন্তু গর্জন ও বর্ষণের মধ্যবর্তী দূরত্ব ঘুচিবে কি না, তাহা লইয়া ঘোর সংশয় আছে। ৩৭৭ ধারার পক্ষে ভারতীয় জনতা পার্টির সমর্থন ঘোষণায় সংশয় ঘোরতর হইল।
অথচ এই ধারাটির এক মুহূর্তও বাঁচিয়া থাকিবার অধিকার নাই। সমকামিতা কাহার পছন্দ, কাহার পছন্দ নয়, সমকামী আচরণ ভারতীয় সংস্কৃতির সহিত সমঞ্জস না তাহার পরিপন্থী, সেই সকল প্রশ্ন লইয়া অনন্তকাল তর্ক চলুক, তাহার সহিত এই আইনটির কিছু মাত্র সম্পর্ক নাই। বস্তুত, ৩৭৭ ধারা ‘প্রকৃতির নিয়মবিরোধী যৌন আচরণ’কে অবৈধ বলিয়া রাখিয়াছে সেই আচরণ সমকামী, বিসমকামী, উভকামী, যে কোনও ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কার্যক্ষেত্রে তাহার কোপ পড়ে সমকামীদের উপরেই, কিন্তু তাহা প্রয়োগের ব্যাপার। যাহার উপরেই প্রয়োগ করা হউক, আইনটি অন্যায়, অবিলম্বে বিতাড়নযোগ্য। কেন অন্যায়? ‘প্রকৃতির নিয়মবিরোধী’ যৌনাচার নির্দিষ্ট করিবার কোনও সর্বজনগ্রাহ্য উপায় নাই বলিয়া? অংশত তাহাই। প্রকৃতির নিয়ম বলিতে কী বোঝায়, তাহা স্পষ্ট নয়, স্পষ্ট করা সম্ভব নয়। অন্য প্রাণীর দৃষ্টান্ত অর্থহীন, মানুষ অন্য প্রাণী নহে। প্রজননের মাপকাঠিতে যৌনাচারের প্রাকৃতিকতা নির্ধারণের নীতিতে ধর্মীয় মৌলবাদীদের আগ্রহ থাকিতে পারে, কিন্তু ভারতীয় আইন তাঁহাদের নির্দেশ মানিয়া চলিবে কেন? প্রকৃতির একমাত্র অর্থ এ ক্ষেত্রে মানবপ্রকৃতি। সেই প্রকৃতি বিচিত্র, বহুধর্মী। সেই বহুত্বই বরণীয়।
ব্যক্তিগত যৌন আচরণ যদি ‘প্রকৃতির নিয়ম’-এর বিরোধী হয়, তাহা হইলেও রাষ্ট্রের কী বলিবার আছে? সেই আচরণ যতক্ষণ কাহারও স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করে, যতক্ষণ তাহা অন্যের ক্ষতি না করে, ততক্ষণ তাহা সম্পূর্ণত ব্যক্তির নিজস্ব পরিসরের বিষয়। সেই পরিসরে রাষ্ট্রের প্রবেশ নিষেধ। ইহাই একটি উদার গণতান্ত্রিক সমাজের মৌলিক ও অলঙ্ঘ্য দাবি। তেমন আচরণ করিলে কত মন্বন্তর নরকবাস করিতে হইবে, তাহা লইয়া যাঁহারা ভাবিত হইতে চাহেন, ভাবিতেই পারেন। যাঁহারা জ্ঞানাঞ্জনশলাকায় মূঢ়জনের চক্ষু উন্মীলিত করিতে চাহেন, করুন। আপন মত প্রচারের অধিকার তাঁহাদেরও প্রাপ্য। কিন্তু রাষ্ট্র কেন সেখানে নাসিকাগ্রটুকুও গলাইবে? ঈশ্বর যদি ‘অনাচারী’কে পাপ দিতে চাহেন, দিবেন, পিনাল কোডে তাঁহার কী প্রয়োজন? পুলিশ দিয়া নৈতিকতা জারি করিবার অধিকার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের থাকিতে পারে না। এই মৌলিক এবং প্রাথমিক কারণেই ৩৭৭ ধারা অনৈতিক, অন্যায়। এখনও এই আইন জারি আছে, ইহাই ভারতীয় গণতন্ত্রের কলঙ্ক। অবিলম্বে কলঙ্কমোচন হউক। তাহার পরে সমকামিতা লইয়া অষ্টপ্রহর তর্ক চলুক, তর্কশীল ভারতের সুনাম অক্ষয় হইবে।


First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.