রাজ আমলের ঐতিহ্যবাহী রাস
পুজোর মরসুম শেষে এ বার রাসের পালা। কথায় বলে, বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। এখন বোধহয় তা বেড়ে তিপান্নয় পৌঁছেছে! আর সেই পরব যদি ঐতিহ্য বহন করে, তবে তো সোনায় সোহাগা। যেমনটা হয়েছে কোচবিহারের রাসের ক্ষেত্রে। রাজ আমলের ঐতিহ্যবাহী রাসমেলা নিয়ে আপাতত মগ্ন এক সময়কার রাজনগর কোচবিহার। এ বছর মেলার ‘২০১তম বর্ষ’। আজ ১৬ নভেম্বর, শনিবার রাসমেলা শুরু হচ্ছে। রাত দশটায় মদনমোহন মন্দির চত্বরে রীতি মেনে, রাসচক্র ঘুরিয়ে উৎসবের সূচনা করবেন ট্রাস্ট বোর্ডের সভাপতি তথা কোচবিহারের জেলাশাসক মোহন গাঁধী।

রাসমেলার আয়োজক কোচবিহার পুরসভা। পুরসভার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এমজেএন স্টেডিয়াম ও লাগোয়া মাঠে এ বার মেলা চলবে টানা পনেরো দিন। সেখানে থাকবে সার্কাস, মরণকূপ, টয়ট্রেন, হরেক রকমের নাগোরদোলা-সহ দু’হাজারেরও বেশি রকমারি দোকান। মেলা উপলক্ষে পুরসভার সাংস্কৃতিক মঞ্চে এ বারেও জমকালো জলসার আয়োজন করা হয়েছে। পুরপ্রধান বীরেন কুণ্ডু বলেছেন, ‘‘রাসমেলার সঙ্গে সমগ্র জেলাবাসীর আবেগ জড়িয়ে রয়েছে। ফলে মেলার আয়োজনে কোনও খামতি রাখা হবে না।’’ অন্য দিকে মদনমোহন মন্দির চত্বরে কীর্তন, ভাগবত-পাঠ, ধর্মীয় যাত্রানুষ্ঠান-সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দেবোত্তর সূত্রের খবর, মূল্যবৃদ্ধির জেরে এ বার রাস উৎসবের বাজেট বাড়ানো হয়েছে। যেখানে গত বছরের বাজেট ছিল ৯ লক্ষ ৪৫ হাজার ৯৭৩ টাকা, এ বছর তা বেড়ে হয়েছে ১১ লক্ষ ৮৯ হাজার ৯৭৩ টাকা।

ইতিহাস ও ঐতিহ্য
১৮১২ সালে কোচবিহারের ভেটাগুড়িতে প্রথম রাসমেলার আয়োজন করা হয়। ওই বছর রাসপূর্ণিমা তিথিতে কোচবিহারের মহারাজ হরেন্দ্রনারায়ণ ভেটাগুড়িতে নব নির্মিত রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করেন। সেই উপলক্ষে সেখানে রাসমেলার আসর বসে। তার পর ১৮৯০ সালে কোচবিহার শহরের বৈরাগী দিঘির পাড়ে মদনমোহন মন্দির নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ হয়। ওই বছর থেকেই মন্দির লাগোয়া এলাকায় মেলা বসছে বলে ইতিহাস গবেষকদের ধারণা। ১৯১৭ সাল নাগাদ ‘প্যারেড গ্রাউন্ড’-এ মেলা স্থানান্তরিত হয়, এখন যেটা রাসমেলার মাঠ নামেই পরিচিত। আয়তন বেড়ে যাওয়াতেই মেলার মাঠ সরানো হয়েছিল। ১৯২৮ সালে মেলায় প্রথম বিদ্যুতের আলো ব্যবহার করা হয়। গত বছর, অর্থাৎ ২০১২ সালে রাসমেলার দু’শো বছর পূর্ণ হয়েছে। এর মধ্যে এক বছরই মেলা বন্ধ ছিল। সালটা ১৯২৩। শহরে কলেরা ছড়িয়ে পড়ায় মেলা বন্ধ করে দেওয়া হয়।

কোচবিহারের রাজাদের কুলদেবতা মদনমোহন দেবের মেলা এই রাস উৎসবকে ঘিরেই, যেখানে ফি বছর দর্শনার্থীদের ঢল নামে। এই জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে তো বটেই, গোটা উত্তরবঙ্গ, অসম, এমনকী প্রতিবেশী দেশ নেপাল, ভুটান থেকেও অসংখ্য মানুষ মেলায় ভিড় জমান।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা
রাসমেলা উপলক্ষে কোচবিহার জুড়ে নিশ্চিদ্র নিরাপত্তার বন্দোবস্ত করেছে জেলা পুলিশ। মেলা চত্বরে পর্যাপ্ত পুলিশ থাকছে। ভিড়ের মধ্যে থাকবেন সাদা পোশাকের পুলিশকর্মীরাও। পাশাপাশি বসানো হয়েছে সিসিটিভিও। মেলা চত্বরেই অস্থায়ী ভাবে পৃথক থানা তৈরি করা হয়। মেলামাঠের একপ্রান্তে তৈরি হয় ওই অস্থায়ী থানা। কাছেই বাঁশ টিন কাঠ দিয়ে গড়া হয় অস্থায়ী লকআপ। মেলার ভিড়ে চুরি ছিনতাই কিংবা মদ্যপ অবস্থায় ঘোরাফেরা থেকে ইভটিজিং— ধরা পড়লেই সোজা ওসি রাসমেলার দফতরে চালান। দীর্ঘ দিনের এই ট্রাডিশন বজায় থাকছে এ বারেও।

বেচাকেনা
ভোট ও রাসমেলা
রাসমেলা চলার সময়ে এ বার কোচবিহার পুরসভার একটি ওয়ার্ডের উপনির্বাচন আছে। তাও আবার রাসমেলা যেখানে বসে, সেই ১৭ নম্বর ওয়ার্ডে। সব দলের প্রার্থীর নাম ঘোষণা হয়ে গিয়েছে। প্রচারও চলছে এক সঙ্গে— নির্বাচন ও রাসমেলার। ভিড় সামলানো নিয়ে চিন্তা বেড়েছে পুলিশ প্রশাসনের কর্তাদের। রাসমেলা লাগোয়া পঞ্চরঙ্গী মোড়, রবীন্দ্র ভবন লাগোয়া রাস্তার কাছেই ২২ নভেম্বর ওই উপনির্বাচনের ভোটগ্রহণ। জেলা পুলিশ সুপার অনুপ জয়সওয়াল জানিয়েছেন, ‘‘রাসমেলা ও ভোট দুই-ই শান্তিপূর্ণ ভাবে সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’’ রাসমেলার দুশো বছরের ইতিহাসে এও এক বেনজির দৃষ্টান্ত।

রাসচক্র ও আলতাফ মিঁঞা
ফি বছরের মতো এ বারেও মদনমোহন মন্দিরে রাসচক্র ঘুরিয়ে উৎসবের সূচনা হবে আজ রাতে। দিনভর উপোস করে পুরোহিতের পাশে বসে বিশেষ পুজো করবেন ট্রাস্ট বোর্ডের সভাপতি। পুরোহিতের নির্দেশ মেনে মন্ত্রোচ্চারণের পর রাসচক্র ঘুরিয়ে রাস উৎসবের সূচনা করবেন তিনি। তার পর ওই রাসচক্র ঘোরানোর সুযোগ পাবেন দর্শনার্থীরা। ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত কোচবিহারের মহারাজারা ওই রাসচক্র ঘুরিয়ে উৎসবের সূচনা করেছেন। মেলা চলা পর্য্যন্ত রাসচক্র ঘোরাতে উপচে পড়ে ভিড়।
বংশানুক্রমিক ভাবে রাসচক্র তৈরির কাজের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন কোচবিহার শহর লাগোয়া হরিণ চওড়ার একটি মুসলিম পরিবার। ওই পরিবারের উত্তরসূরি আলতাফ মিঁঞার দায়িত্বে এখন রাসচক্র নির্মাণ হয়। তিনি লক্ষ্মীপুজোর দিন থেকে চক্র গড়ার কাজ শুরু করেন। এ বারেও তার হেরফের হয়নি। বাঁশ কেটে বাতা তৈরি করে শুকিয়ে কাগজের কারুকাজ, পাট দিয়ে গড়া দেবদেবীর ছবি আটকানো সবটাই নিজের হাতে। তাই ২২ ফুট উঁচু কোচবিহারের রাসচক্র যেন সর্বধর্ম সমন্বয়ের প্রতীক। আলতাফ জানিয়েছেন, ‘‘প্রায় ৩০ বছর ধরে আমি রাসচক্র গড়ছি। ছেলেকেও শেখাচ্ছি। আমার আগে দাদু পান মহম্মদ মিঁঞা, বাবা আজিজ মিঁঞা এই কাজ করেছেন। পরম্পরাটা ধরে রাখতে চাই।’’

পুতনা রাক্ষসী ও পুতুলঘর
এখানকার রাসমেলার অন্যতম আকর্ষণ, পুতনা রাক্ষসীর বিশালাকার মূর্তি। তার টান এড়ানো মুশকিল। মদনমোহন মন্দির চত্বরের এক প্রান্তে বড়সড় ট্রলির উপর ওই মূর্তি তৈরি করা হয়। এ বারেও মৃৎশিল্পী পূর্ণেশ্বর চিত্রকরের হাতের ছোঁয়ায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে পুরাণের খণ্ডচিত্র।

মেলা উপলক্ষে মদনমোহন মন্দির চত্বরে ধর্মীয় কাহিনি মডেলের মাধ্যমে পুতুলঘরে সাজিয়ে রাখাটাও এখানকার পুরনো ঐতিহ্য। রামায়ণ-মহাভারতের বিভিন্ন কাহিনির টুকরো ছবি ছাড়াও নানা ধর্মীয় গল্পও মূর্তির মডেলের মাধ্যমে মন্দিরের দেওয়াল লাগোয়া এলাকা জুড়ে তৈরি পুতুলঘরে সাজিয়ে রাখা হয়। রাতের আলোকসজ্জায় এ সবই হয়ে ওঠে নজরকাড়া। কোচবিহারের সদর মহকুমাশাসক তথা বোর্ডের সদস্য বিকাশ সাহা জানিয়েছেন, ‘‘পুতনা মূর্তি থেকে পুতুলঘর, সবই এ বার নতুন করে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

জিলিপি লড়াই
রাসমেলা যেন রস মেলাও। মেলার মাঠে ফি বছর রকমারি জিলিপির ধুন্দুমার লড়াই দেখা যায়। এ বারেও তার প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছে। উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, জিলিপির রসের টানেও বহু মানুষ মেলায় আসেন। তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখা নিয়েই জমে ওঠে বিক্রেতাদের লড়াই। জিলিপি সম্ভারের কিছু উল্লেখযোগ্য পোশাকি নাম— ভেটাগুড়ির জিলিপি, বাবুরহাটের জিলিপি, পুণ্ডিবাড়ির জিলিপি, নীলকুঠির জিলিপি, দেওয়ানহাটের জিলিপি ইত্যাদি। মেলা ঘোরার ফাঁকে শীতের রাতে পছন্দের গরম জিলিপি খাওয়ার হাতছানি রসপ্রেমীরা হাতছাড়া করবেন কি করে! তাই রাসমেলা হয়ে ওঠে রসের মেলাও।

টমটম গাড়ি
রাসমেলায় ছোটদের রকমারি হাজারো খেলনা আসে। তার মধ্যে অন্যতম, টমটম গাড়ি। বিহারের কিষাণগঞ্জ থেকে ফি বছর আকবর আলি আজমল শেখের মতো ৫০জনের বেশি বিক্রেতা টমটম গাড়ি নিয়ে মেলায় পসরা জমান। মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ হাইস্কুল লাগোয়া এলাকায় রাস্তার পাশে ডেরা বেঁধে চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টমটম গাড়ি তৈরি করেন এঁরা। মেলা ঘুরে সেই গাড়ি ফিরিও করেন। সাতসকালে কোচবিহারের বিভিন্ন এলাকা ঘুরেও বিক্রি চলে। বাঁশ কেটে তার উপর অনেকটা মাটির বাটির আকারের পাত্র বসিয়ে প্লাস্টিকে মুড়ে দেওয়া হয়। তার মধ্যে বাঁশের কাঠি ও মাটির চাকা বসিয়ে তৈরি হয় টমটম গাড়ি। এক সময় এক টাকায় ওই টমটম গাড়ি বিক্রি হতো। এখন দাম প্রায় দশ গুণ বেড়েছে। তাই বলে কদর কমেনি। ছোটদের যে ওই খেলনা চাইই চাই...

ছোটদের জন্যে
খেলনার পসরা নাগোরদোলা
ছবি: হিমাংশুরঞ্জন দেব




 


First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.