বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কাউন্টডাউন শুরু, কাল পাড়ি মঙ্গলে
বিবার ভোর ৬টা বেজে ৮ মিনিট। অন্ধ্রের শ্রীহরিকোটায় শুরু হয়ে গেল মঙ্গলযাত্রার ‘কাউন্টডাউন’। ৫৬ ঘণ্টা ৩০ মিনিটের এই কাউন্টডাউন শেষেই মঙ্গলবার দুপুর ২টো ৩৮ মিনিটে লাল গ্রহের উদ্দেশে পাড়ি দেবে ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি মঙ্গলযান।
ভারতীয় মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে ৫ নভেম্বর তারিখটা মাইলফলক হয়ে থাকবে কি না, এ দেশের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ‘ইসরো’ তাদের প্রথম মঙ্গল অভিযানের সফল সূচনাতেই বিশ্বের সম্ভ্রম আদায় করে নিতে পারবে কি না, এমনকী অভিযানের যৌক্তিকতা নিয়ে ভারতীয় বিজ্ঞানীদেরই একাংশ যে সব প্রশ্ন তুলেছেন, তার প্রাথমিক জবাবটা ইসরো দিতে পারবে কি না সবেরই উত্তর মিলবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে।
এখনও পর্যন্ত আমেরিকা, রাশিয়া, চিন, জাপান এবং ইউরোপীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ছাড়া আর কেউ মঙ্গল অভিযানের সাহস দেখায়নি। সে ক্ষেত্রে ভারতের উৎক্ষেপণ সফল হলে তা অবশ্যই ইসরোর মুকুটে নয়া পালক। এর পর মঙ্গলযানকে পাড়ি দিতে হবে ১০ মাসের পথ। বিজ্ঞানীরা বলছেন, সব ঠিক থাকলে আগামী সেপ্টেম্বরে যানটি মঙ্গলের কাছাকাছি পৌঁছে তার অভিকর্ষ বলের প্রভাবে চারপাশে পাক খাওয়া শুরু করবে। নাসার ‘কৌতূহল’-এর (কিউরিওসিটি রোভার) মতো মঙ্গলের মাটিতে অবশ্য পা পড়বে না ভারতীয় যানের। বরং মঙ্গলকে প্রদক্ষিণ করতে করতেই তার মাটি ও আবহাওয়ার বিশ্লেষণ করবে সে। সেই তথ্য সে পাঠিয়ে দেবে ইসরোর বিজ্ঞানীদের কাছে।
হঠাৎ মঙ্গলযাত্রা কেন? বিজ্ঞানীদের একাংশ বলছেন, চন্দ্রযান অভিযানের সাফল্যই মঙ্গলের রহস্যভেদে উৎসাহিত করেছে ইসরোকে। ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০০৮-এ চন্দ্রযানের আগে পর্যন্ত শুধু নিজস্ব উপগ্রহই উৎক্ষেপণ করে গিয়েছে ইসরো। এমন বড় মাপের কোনও অভিযান কার্যত করেইনি তারা। অবশেষে চন্দ্রযান চাঁদের চারদিকে চক্কর কেটে তুলে আনে বেশ কিছু চমকপ্রদ তথ্য। যা বিশ্লেষণ করে ইসরোর বিজ্ঞানীরা বলছেন, চাঁদ এক সময় গলিত অবস্থায় ছিল এবং সেখানে পরে জলের অস্তিত্বও ছিল।
পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহে এমন দাপুটে অভিযানের পরেই ভিন্ গ্রহে অভিযানের সলতে পাকানো শুরু করে ইসরো। সংস্থা সূত্রে বলা হচ্ছে, অভিযানের পরিকল্পনাটা শুরু হয়েছিল ২০০৯ সালে, জি মাধবন নায়ার যখন সংস্থার প্রধান। শেষ পর্যন্ত তাতে সিলমোহর পড়ে ২০১২-র অগস্টে। স্বাধীনতা দিবসের বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ ঘোষণা করেন, ২০১৩ সালে মঙ্গল অভিযান করবে ভারত।
যাত্রা মঙ্গল
তার পর থেকে টানা পনেরো মাস। পাঁচশো জন ভারতীয় বিজ্ঞানীর অক্লান্ত পরিশ্রমে গড়ে উঠেছে ন্যানো গাড়ির মাপের এক মহাকাশযান। তাতে বসানো রয়েছে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি পাঁচ-পাঁচটি সন্ধানী ‘যন্ত্র-চোখ’। মঙ্গলের পরিমণ্ডলে মিথেনের মতো গ্যাস রয়েছে কি না, তা যেমন খোঁজা হবে, তেমনই নজর করা হবে মঙ্গলের দুই উপগ্রহ ফোবস এবং ডিমোস-কেও। মিথেন খোঁজার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মিথেন তৈরি হয় কার্বন ও হাইড্রোজেন দিয়ে। অর্থাৎ, যে দু’টি মৌল জীবকোষ তৈরির প্রাথমিক বা ন্যূনতম উপাদান।
মঙ্গলযাত্রা সফল হলে কতটা উপকৃত হবে দেশ? বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব অ্যাস্ট্রোফিজিক্স-এর বিজ্ঞানী সুজন সেনগুপ্ত বলছেন, এই অভিযানে যে তথ্য মিলবে, তা একেবারেই ভারতের নিজস্ব। এর ফলে দেশের মহাকাশ গবেষকরা উপকৃত হবেন। কারণ, গবেষণার জন্য এখন নাসা-র সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলতে হয়। নিজের দেশের সংস্থার হাতে তথ্য থাকলে তা পেতেও সুবিধে হবে।
ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সেস-এর বিজ্ঞানী বাণীব্রত মুখোপাধ্যায় অবশ্য মনে করেন, তথ্য দরকার হলে নাসা-র কাছ থেকে পেতে তেমন অসুবিধা হয় না। তবে তিনি বলছেন, “এই অভিযান ভারতকে প্রযুক্তির দিক দিয়ে প্রথম সারির দেশগুলির সঙ্গে একাসনে বসিয়ে দেবে।” ঠিক যেমন ভাবে নাসা-র প্রযুক্তি নিয়ে এত দিন চর্চা করেছে সব দেশ, তেমনই এ বার ইসরো-র ইঞ্জিনিয়ারদের নিয়েও আলোচনা চলবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যাক, মঙ্গলযানকে বানানোই হয়েছে এমন ভাবে, যাতে ছোটখাটো যান্ত্রিক গোলযোগ হলে প্রাথমিক পদক্ষেপটা সে নিজেই করতে পারবে। ইসরোর অভিযানে নাসা অবশ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি দিয়ে সাহায্য করবে। তারাও আগামী ১৮ নভেম্বর কেপ ক্যানাভেরাল থেকে একটি যান পাঠাচ্ছে মঙ্গলের কক্ষপথে।
বাণীব্রতবাবুরা আশার কথা শোনালেও অভিযান নিয়ে প্রশ্নও তুলেছেন অনেকে। যাঁদের মধ্যে আছেন জি মাধবন নায়ার স্বয়ং। মূল প্রশ্ন যেটা উঠছে, তা হল ‘কিউরিওসিটি’ যেখানে মঙ্গলের মাটি চষে ফেলে নানা তথ্য, এমনকী নদীখাত পর্যন্ত খুঁজে পেয়েছে, সেখানে ভারতীয় মঙ্গলযান আর নতুন কী করবে?
ইসরোর বিজ্ঞানীদের জবাব, কিউরিওসিটি রোভার বা তার আগের রোভারগুলি মঙ্গলের নির্দিষ্ট জায়গায় ঘুরে কাজ করেছে। কিন্তু ভারতের যানটি মঙ্গলের চার দিকে পাক খেতে খেতে ছবি তুলবে। ইসরোর গবেষকের কথায়, “কিউরিওসিটি কিন্তু মঙ্গলে মিথেন খুঁজে পায়নি। আমাদের যানে বসানো বিশেষ সেন্সর মিথেন খুঁজে পেলে সেটা নতুন আবিষ্কার হবে।”
একই মত সুজনবাবুরও। তিনি বলছেন, “কোনও নির্দিষ্ট জায়গার বদলে অনেক বড় এলাকায় গবেষণা ও নজরদারি চালাবে ইসরোর মহাকাশযান। এর ফলে এত দিন যে তথ্য মিলেছে, তার থেকে সম্পূর্ণ নতুন ও যুগান্তকারী তথ্যও মিলতে পারে।”
মাধবন নায়ার অবশ্য প্রশ্ন তুলেছেন মূলত অভিযানে পাঠানো যন্ত্রপাতির সংখ্যা ও পরিকল্পনা নিয়ে। তিনি বলছেন, ইসরো যে সব যন্ত্রপাতি নিয়ে অভিযান চালাচ্ছে, তা যথেষ্ট নয়। মঙ্গলের যতটা কাছে এই মহাকাশযান পৌঁছবে, তাতেও যথেষ্ট তথ্য মিলবে না বলে তিনি মনে করেন। মঙ্গল অভিযানের অন্যতম পরিকল্পনাকারী মাধবন নায়ার এমন কথা বলছেন কেন, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে। মাধবন নায়ার অবশ্য বলছেন, “আমি মঙ্গল অভিযানের বিরুদ্ধে নই। কিন্তু ১৫টি যন্ত্র নিয়ে অভিযানের পরিকল্পনা হয়। সেখানে এখন ৫টি যন্ত্র মহাকাশযানের সঙ্গে পাঠানো হচ্ছে। এর ফলে খুব বেশি উপযোগী তথ্য মেলার সম্ভাবনা কম।” মাধবন নায়ার মনে করেন, ইসরো যে ‘পিএসএলভি’ (পোলার স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকেল) রকেটে চাপিয়ে মঙ্গলযানকে পাঠাচ্ছে, তার ভারবহন ক্ষমতা অনেক কম। বরং ‘জিএসএলভি’ (জিওসিনক্রোনাস স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকেল) ব্যবহার করা হলে অনেক বেশি যন্ত্র পাঠানো যেত।
ইসরোর বিজ্ঞানীদের বক্তব্য, অনেক যন্ত্রই পাঠানো যেতে পারত। কিন্তু হাতে সময় খুব বেশি ছিল না। জিএসএলভি-ও আপাতত ব্যবহার করা সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে মঙ্গলযানের নক্সাও হয়তো বদলাতে হত। তাই নানা দিক বিচার করে সব থেকে সব চেয়ে উপযোগী পাঁচটি যন্ত্রকে বেছে নেওয়া হয়েছে। কারণ মঙ্গল অভিযানের ক্ষেত্রে সময়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
কেন? ইসরোর এক মুখপাত্র ব্যাখ্যা দিলেন, ভিন্গ্রহে অভিযানের ক্ষেত্রে মহাকাশযানটিকে একটি উপবৃত্তাকার কক্ষপথে পাঠানো হয়। তার আগে হিসেব-নিকেশ করে দেখা হয়, নির্দিষ্ট সময় পরে কক্ষপথ বরাবর চললে মহাকাশযানটি ওই গ্রহের কাছাকাছি পৌঁছতে পারছে কি না। বিষয়টা অনেকটা উড়ন্ত পাখিকে গুলি করার মতো। এ ক্ষেত্রে আবার মহাকাশযানের জ্বালানি সাশ্রয়ের দিকটাও মাথায় রাখতে হয়, যাতে অহেতুক বেশি দূরত্ব পাড়ি দিতে না হয় তাকে। ওই মুখপাত্র বলেন, “হিসেব বলেছে, ২০১৩-র ১৯ নভেম্বরের মধ্যে উৎক্ষেপণ করা হলে যানটি আগামী বছরের সেপ্টেম্বরে মঙ্গলের কাছাকাছি পৌঁছবে। আর ওই তারিখের মধ্যে উৎক্ষেপণ না হলে এমন সুযোগের জন্য ২০১৬ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হত।”
বৈজ্ঞানিক হিসেবনিকেশের বাইরে অন্য প্রশ্নও উঠেছে বিজ্ঞানী মহলে। অনেকে বলছেন, দেশের যোগাযোগ ও আবহাওয়া গবেষণার জন্য উপগ্রহ তৈরি না করে মঙ্গল অভিযানে এত টাকা খরচ করছে কেন ইসরো? গত দশকের মাঝামাঝি ‘অ্যাস্ট্রোস্যাট’ নামে জ্যোতির্বিজ্ঞানের গবেষণায় প্রয়োজনীয় একটি উপগ্রহ উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ক্রমাগত তার উৎক্ষেপণের সময় পিছিয়ে চলেছে। সে দিকে কেন নজর দেওয়া হচ্ছে না, প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। মাধবন নায়ার নিজেই অভিযোগ করছেন, হুড়োহুড়ি করে এই অভিযান নিছক মহাকাশ-দৌড়ে সামিল হওয়ার জন্যই।
মহাকাশ দৌড় প্রসঙ্গেই উঠে আসছে চিনের সঙ্গে দ্বৈরথের প্রসঙ্গ। ২০১১ সালে রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে একটি মঙ্গল অভিযান চালিয়েছিল চিন। কিন্তু উৎক্ষেপণের পরে সেই যানটি পার্থিব কক্ষপথ ছেড়ে বেরোতে পারেনি। সে দিক থেকে মঙ্গলবারের অভিযান সফল হলে মহাকাশ গবেষণায় চিনকে পিছনে ফেলা সম্ভব হবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে এমনটা মনে করেন না ইসরোর বর্তমান চেয়ারম্যান কে রাধাকৃষ্ণন। তিনি বলেন, “সব দেশেরই নিজস্ব মহাকাশ গবেষণা নীতি রয়েছে। আমাদের প্রতিযোগিতা নিজেদের সঙ্গেই।” ইসরো সূত্রে বলা হচ্ছে, প্রযুক্তিগত কারণেই অ্যাস্ট্রোস্যাট-এর উৎক্ষেপণ পিছিয়ে গিয়েছে। আগামী বছরে এটি উৎক্ষেপণ হতে পারে।
মঙ্গল অভিযানের প্রেক্ষিতে যাবতীয় প্রশ্ন উড়িয়ে ইসরোর বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, এই অভিযানের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি, অন্য গবেষণা বা অ্যাস্ট্রোস্যাট উৎক্ষেপণকে গোলানো উচিত নয়। ইসরো চেয়ারম্যান বলছেন, “কাজ করার জন্য যেমন হাতের পাঁচ আঙুলের সমান পরিচর্যা দরকার, তেমনই মহাকাশ বিজ্ঞানে সার্বিক উন্নতির জন্যও দরকার সব শাখাতেই সমান গুরুত্ব!”



First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.