সস্তা প্রচারের হাতিয়ার সেই আইন অমান্য
ভাই এতটা সক্রিয় রাজনীতি করে জানলে চড় মেরে হলেও আটকাতেন! বুধবার কথা বলতে বলতে ডুকরে উঠলেন সুদীপ্ত গুপ্তর দিদি সুমিতা সেনগুপ্ত: তা হলে তো আর ভাইকে হারাতে হত না!
ভাইকে হারানোর এক দিন পরে এবিপি আনন্দের ক্যামেরার সামনে ছাত্রদের রাজনীতিতে টেনে আনারই কড়া সমালোচনা করেন সুমিতাদেবী। যাঁদের ছেলেমেয়েরা রাজনীতি করেন, সেই সব বাবা-মায়ের প্রতি সুমিতার আবেদন, “দরকার হলে ওদের চড় মেরে আটকান। বাবা-মায়ের হাতে মার খেলে বাচ্চারা মরে না। পুলিশের লাঠি খেলে মরে!”
এমন একটা দিনে সুমিতাদেবী এই ক্ষোভ জানিয়েছেন, যে দিন সামগ্রিক ভাবে ছাত্র রাজনীতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ছাত্রদের নিয়ে আইন অমান্যের মতো আন্দোলনে নেমে পড়াটাও সমালোচনার মুখে। রাজ্য রাজনীতির সঙ্গে যাঁরা ওয়াকিবহাল, রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে আইন অমান্য নিয়ে তাঁদের বক্তব্য, যুগ বদলেছে। সরকার বদলেছে। বদলেছে বিরোধী। নেতাদের মুখ বদলেছে। কিন্তু আইন অমান্যের ট্র্যাডিশন চলছেই!
ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে গাঁধীর আইন অমান্যের ভিন্ন প্রেক্ষাপট এবং তাৎপর্য ছিল। যুগান্তর ঘটে গেলেও হরেক কিসিমের রাজনৈতিক দল সেই বহুল ব্যবহৃত অস্ত্র ছাড়েনি! এই ধরনের কর্মসূচিতে মুহূর্তের উত্তেজনায় অঘটন যে ঘটে যেতে পারে, নেতাদের অজানা নয়। আন্দোলনকারীরা পুলিশি ব্যারিকেড ভাঙতে গিয়ে সংযম হারাতে পারেন। আবার পুলিশও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কখনও সখনও বাড়াবাড়ি করে ফেলতে পারে। অতীত অভিজ্ঞতায় এমন দৃষ্টান্ত আছে বহু।
শেষ শ্রদ্ধা। এসএফআই দফতরে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। ছবি: দেবাশিস রায়
এই প্রশ্নকে আরও প্রাসঙ্গিক করে দিল মঙ্গলবারের ঘটনা। সে দিন ব্যারিকেড ভেঙে আইন অমান্যের আগে রীতিমতো তপ্ত ছিল আবহ। গাঁধীবাদী আইন অমান্যের পথে কখনও হাঁটেনি বামপন্থী দলগুলি। এ দিনও তার অন্যথা হয়নি। আইন অমান্যকে গুরুত্বপূর্ণ করে দেখাতেই ছাত্র-নেতারা আবহ তপ্ত করে তোলেন। জোরালো স্লোগানের সঙ্গে নেতারা মারমুখী চেহারা নেন বলেই জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। ফলে উল্টো দিকে পুলিশও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। রাজনীতিরই কেউ কেউ বলছিলেন, এ যেন যুদ্ধের আগে চিৎকার-চেঁচামেচি করে লড়াইয়ের হাওয়া তৈরি করা। এই অবস্থায় সব সময় সকলের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। ফলে ধাক্কাধাক্কি বা সংঘর্ষ হওয়াটা অসম্ভব কিছু নয়। এই হল্লার পরে যখন ধাক্কা দিয়ে ব্যারিকেড ভেঙে আইন অমান্য করতে যান ছাত্র নেতারা, তখন সেটা আর গাঁধীবাদী আন্দোলন থাকে না।
এই ভাবে হল্লা তুলে আইন অমান্য এবং তাতে সুদীপ্তর মতো অল্প বয়সী ছাত্রদের জড়িয়ে ফেলা প্রকারান্তরে এই বিষয়টির সমালোচনা করেছেন সুমিতাদেবী। বলেছেন, “ছাত্রদের মন দিয়ে পড়াশোনা করা উচিত।”
বলেছেন, “শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতি বন্ধ হোক।” বলেছেন, “সিপিএমই ওর (সুদীপ্তর) মগজধোলাই করেছে। তাকে সব রকম ভাবে ব্যবহার করেছে।” মগজ ধোলাইয়ের জেরেই যে সুদীপ্তর মতো তরতাজা বহু ছাত্রছাত্রী আইন অমান্যের মতো আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন, সে কথা বলছেন অনেকেই। তাঁদের বক্তব্য, এই ধরনের আন্দোলনে ছাত্রদের ব্যবহার করাটা অনেক সহজ। না বুঝেই যথেষ্ট ঝুঁকির মধ্যে গিয়ে পড়েন তাঁরা। পুলিশ যে কোনও সময় মারমুখী হয়ে উঠতে পারে, ফলে বাড়তে পারে প্রাণের আশঙ্কা এ সব জেনেও রাজনৈতিক নেতারা আইন অমান্যের মতো এমন ঝুঁকিপূর্ণ আন্দোলন থেকে বিরত হন না!
কেন? রাজনীতির কুশীলবেরাই একান্ত আলাপে স্বীকার করেন, এতে প্রচার পাওয়া যায় ভাল। সামান্য একটু গোলমাল বাধিয়ে দিতে পারলে আজকের ২৪ ঘণ্টার নিউজ চ্যানেলের জমানায় তো আরও কপাল খুলে গেল! প্রশাসকেরা মনে করেন, সরকারি আইন, প্রশাসনের নিয়ম-নীতি মানছি না এইটা দেখাতে পারলে বেশ বীরত্ব দেখানো যায়। তাই ঝুঁকি, উত্তেজনা, সংঘর্ষ এবং ক্ষয়ক্ষতি, মায় প্রাণহানির পরোয়া না-করে আইন অমান্যের চল দিব্যি চালু!
সুমিতা সেনগুপ্ত (সুদীপ্তর দিদি)

যদি জানতাম ভাই এতটা সক্রিয় রাজনীতি করে,
তা হলে চড় মেরে আটকাতাম।
এবং কী আশ্চর্য! পৃথিবীর আর যে কোনও বিষয়ে যাঁরা ভিন্ন মেরুতে অবস্থান করবেন, আইন অমান্যের বেলায় তাঁরা ভাই ভাই! বাম-ডান, সিপিএম-তৃণমূল সবাই নানা সময়ে নানা কারণে আইন অমান্য করেছে। ভবিষ্যতেও করবে। আন্দোলনের এমন ধারার যে বিকল্প নেই, সমস্বরে তা-ই বলছেন সিপিএমের শ্যামল চক্রবর্তী, তৃণমূলের সুব্রত মুখোপাধ্যায়, কংগ্রেসের মানস ভুঁইয়া। এমনকী, এসইউসি-র প্রভাস ঘোষও।
ছয়-সাতের দশকে বাম ছাত্র আন্দোলনের বিখ্যাত জুটি ছিলেন শ্যামল-সুভাষ। বিশ্বব্যাঙ্কের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রবার্ট ম্যাকনামারার সফরের বিরুদ্ধে কলকাতা কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন তাঁরা! সুভাষ চক্রবর্তী প্রয়াত। তাঁর এককালীন সঙ্গী, সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শ্যামলবাবু বলছেন, “রাজনৈতিক দল হিসাবে আমাদের লক্ষ্য এমন আন্দোলনের কর্মসূচি নেওয়া, যাতে সমাজের সব অংশের মানুষ অংশগ্রহণ করতে পারেন। আইন অমান্য সেই রকমই একটা যুগোত্তীর্ণ আন্দোলনের পদ্ধতি। ব্যারিকেড পেরিয়েও আন্দোলনকারীরা তো পুলিশের কাছেই যায়! এতে অশান্তির কিছু নেই। ‘সিস্টেমে’র প্রতি অনাস্থা প্রকাশের জন্য প্রতীকী অর্থে এই আন্দোলন করা হয়। সব দল করে। আগেও হয়েছে, এখনও হয়।” তবে একই সঙ্গে বর্ষীয়ান নেতা শ্যামলবাবুর বক্তব্য, “আমরা বহু আইন অমান্য করেছি। কিন্তু পুলিশের হেফাজতে চলে যাওয়ার পরে মঙ্গলবার কলকাতায় যেমন ঘটনা ঘটেছে, কখনও কোথাও হয়েছে বলে শুনিনি!”
বস্তুত, মঙ্গলবার শহরে প্রশাসন তথা শাসক দলের ভূমিকাও সব মহলকে বিস্মিত করেছে! ওই দিন বাম ছাত্র সংগঠনগুলির আইন অমান্যের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল রানি রাসমণি অ্যাভিনিউয়ে। একই জায়গায় পরে বামফ্রন্টের পঞ্চায়েত ভোট নিয়ে অবস্থানেরও অনুমতি ছিল। কিন্তু তৃণমূল যে রাতারাতি মেট্রো চ্যানেলে অবস্থান কর্মসূচি নিয়েছিল, তার কোনও আনুষ্ঠানিক অনুমতিই ছিল না! স্বভাবতই প্রশ্ন, শাসক দলই যদি আইনের শাসনের তোয়াক্কা না-করে, বিরোধীদের কাছে কী প্রত্যাশা করা হবে? ধর্মতলাকে কেন্দ্র করে কাছাকাছি সময়ে তিনটি কর্মসূচি পুলিশের ঘাম ছুটিয়ে দিয়েছিল। যদিও অপ্রীতিকর ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত ঘটেছে প্রেসিডেন্সি জেল চত্বরে।
বর্তমান শাসক দলের নেতারাও নীতিগত ভাবে আইন অমান্যে অন্যায়ের কিছু দেখছেন না। বামেদের যেমন শ্যামল-সুভাষ, কংগ্রেসের ছাত্র পরিষদের তেমনই সোনালি জুটি ছিল প্রিয়-সুব্রত। অধুনা রাজ্য সরকারের বর্ষীয়ান মন্ত্রী সুব্রতবাবু সাফ বলছেন, “আইন অমান্যের কোনও বিকল্প এখনও কেউই ভেবে উঠতে পারেনি। স্বাধীনতার পর থেকে এই আন্দোলনটাকে বড় জায়গায় নিয়ে গিয়েছে কমিউনিস্টরা। আমরা ওদের দেখে অনেক কিছুই শিখেছি। এটাও শিখেছি! একটা দল এই আন্দোলন করে যদি বড় হতে পারে, আমরাই বা কেন পারব না?” ছাত্র পরিষদের এই বিখ্যাত প্রাক্তনীর মতে, নীতি ও আদর্শের ভিত্তিতে আইন অমান্য হলে তাতে অন্যায় কিছু নেই। কিন্তু সে আন্দোলন যদি ক্ষমতার খেলার অংশ হয়, শুধু ছবি তোলা উদ্দেশ্য হয় তা হলে তার পরিণতি ভাল হতে পারে না। আর ঝুঁকি, হিংসার আশঙ্কা? সুব্রতবাবুর জবাব, “সেটা নেতৃত্বের উপরে নির্ভর করে। আমাদের সৌভাগ্য, প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির মতো এক জন সেনাপতি পেয়েছিলাম! ছাত্রদের উপরে যার ‘সুপ্রিম কন্ট্রোল’ ছিল। আমার মনে আছে, এক বার পুলিশের ব্যাজ খুলে নেওয়ার ডাক দেওয়া হল। এক ঘণ্টা আগে প্রিয়দা বলল, কেউ ও সব করবে না। কেউ কিন্তু পুলিশের উর্দি বা টুপিতে হাত দেয়নি!”
ছাত্র পরিষদেই হাতে খড়ি-হওয়া কংগ্রেস নেতা মানস ভুঁইয়া যুক্তি দিচ্ছেন, “কোনও সিদ্ধান্ত পছন্দ না-হলে গণতন্ত্রে আমি কি বোমা মারতে পারি? পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরাতে পারি? না! ১৪৪ ধারা ভেঙে চোখে আঙুল দিয়ে সরকারকে দেখাতে পারি, তোমার নিয়ম মানছি না! আইন অমান্য আন্দোলনের দর্শনটা এই জায়গায়।” তাঁর মতে, পুলিশ বা আন্দোলনকারীদের ভুলে কোনও ঘটনা ঘটলে তা আলাদা প্রশ্ন। কিন্তু গাঁধীবাদী এই আন্দোলনের ঘরানা সেটা নয়।
কলকাতার রাস্তায় আইন অমান্যের নামে পুলিশের মনে বছরের পর বছর ভয় ধরিয়ে দিত এসইউসি। প্রতি বছর ৩১ অগস্ট তারা নিয়ম করে আইন অমান্য করে। এসইউসি-র সাধারণ সম্পাদক প্রভাসবাবুর ব্যাখ্যা, “প্রাক্-স্বাধীনতা আমল থেকে চলে-আসা এই আন্দোলনের ঐতিহ্য ত্যাগ করতে হবে, এমন কোনও কারণ তো ঘটেনি! মিছিল, অবস্থান, ধর্মঘটের মতো এটাও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের একটা পদ্ধতি। আন্দোলনকারীরা জানে, তারা গ্রেফতার বরণ করবে। পুলিশও জানে, আন্দোলনকারীরা গ্রেফতার বরণ করবে। এতে সমস্যা কোথায়?” প্রভাসবাবু উদাহরণ দিচ্ছেন, ১৯৯০ সালে তাঁদের আইন অমান্যে পুলিশের গুলিতে মাধাই হালদারের প্রাণ গিয়েছিল। সেটা পরিস্থিতি মোকাবিলার ব্যর্থতা। আন্দোলনের নয়। আন্দোলন নির্বিকল্প! সুদীপ্ত গুপ্তের প্রাণ এমন কী আর দামি?



First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.