কড়েয়ায় তিন পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা
তার তেমন কোনও রাজনৈতিক দাদা ছিল না। তার বদলে ছিল পুলিশের আশ্বাসের হাত।
কড়েয়া-কাণ্ডের মূল অভিযুক্ত শাহজাদা বক্স সম্পর্কে বলতে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে তার এমনই ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। কড়েয়ার যুবক মির আমিরুল ইসলামের আত্মহত্যা ঘিরে তোলপাড়ের পর শেষ পর্যন্ত অবশ্য তিন পুলিশকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা রুজু হয়েছে। সুইসাইড নোটে আমিরুল লিখেছিলেন, শাহজাদার বিরুদ্ধে নাবালিকাকে ধর্ষণের অভিযোগ প্রত্যাহার করতে ওই তিন পুলিশই তাঁকে চাপ দিয়েছিলেন এবং ডাকাতির মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়েছিলেন।
কলকাতা পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার (অপরাধদমন) পল্লবকান্তি ঘোষ বৃহস্পতিবার জানান, কড়েয়া থানার দুই অফিসার বিনোদ কুমার ও রঞ্জিত যাদব এবং কনস্টেবল নাসিম খানের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে আমিরুলের পরিবার। তার ভিত্তিতেই ওই তিন জনের বিরুদ্ধে মামলা রুজু হয়েছে। আমিরুল-কাণ্ডে কড়েয়া থানার ভূমিকা কী ছিল, ইতিমধ্যেই কলকাতার পুলিশ কমিশনারের কাছে তা জানতে চেয়েছে রাজ্য মহিলা কমিশন। নাবালিকা ধর্ষণের অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ কী ব্যবস্থা নিয়েছে, জানাতে হবে তা-ও।
বস্তুত, কড়েয়া থানার পুলিশের বিরুদ্ধে একাধিক বিস্ফোরক অভিযোগ এনেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা এবং আমিরুলের ঘনিষ্ঠমহল। তাঁদের দাবি, কখনও বেআইনি বাড়ি নির্মাণ, কখনও তোলা আদায়, কখনও কারও বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করে টাকা নিয়ে মামলা তোলা এ সব কাজে কড়েয়া থানার পুলিশ শাহজাদাকে কাজে লাগাত। পুলিশের লোক পরিচয়ে শাহজাদা বিভিন্ন অভিযানে যেমন যেত, তেমনই অনেক সময়েই তাকে পুলিশের গাড়িতে দেখা যেত। আমিরুলের এক আইনজীবী পরামর্শদাতার অভিযোগ, অবৈধ বাড়ি নির্মাণকারী এবং পুলিশের মধ্যে বোঝাপড়ার কাজ করত শাহজাদা। সেটাই তার মূল শক্তি। এমনকী যে বাড়িতে তার পরিবার থাকে, সেটিও বেআইনি নির্মাণ বলে অভিযোগ।
বৃহস্পতিবার কড়েয়া থানার সামনে বিক্ষোভ।
ধর্ষণের শিকার নাবালিকা এ দিনও কড়েয়া থানার পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “নিজেকে পুলিশের ইনফর্মার বলে ভয় দেখিয়ে শাহজাদা চার নম্বর ব্রিজের কাছে নিয়ে গিয়ে আমাকে ধর্ষণ করত। ভয়ে পুলিশের কাছে যাইনি। গুড্ডু ভাই (আমিরুল)-কে সব জানাই। গুড্ডু ভাই আমাকে নিয়ে থানায় যান অভিযোগ জানাতে। পুলিশ বলে আমি শাহজাদার বিরুদ্ধে মিথ্যে অভিযোগ করছি। অভিযোগ লেখার পরেও তা নিতে রাজি হচ্ছিল না।”
শেষ পর্যন্ত আমিরুলের চাপেই শাহজাদার বিরুদ্ধে অভিযোগ নিতে বাধ্য হয় পুলিশ। আমিরুলের বাবা ইজহারুল ইসলামের অভিযোগ, এতেই শাহজাদার ঘনিষ্ঠ কিছু পুলিশকর্মী চটে যান। তাই আমিরুলের বিরুদ্ধে শাহজাদার স্ত্রীকে দিয়ে ডাকাতির অভিযোগ করানো হয়। কেবল তাঁর ছেলেকে নয়, পুলিশ তাঁকেও হুমকি দিত বলেও অভিযোগ করেছেন ইজহারুল।
শাহজাদার বিরুদ্ধে যে দিন (৩১ অক্টোবর) কড়েয়া থানায় ধর্ষণের অভিযোগ প্রথম দায়ের হয়, সে দিনই পাড়ার লোক তার বিরুদ্ধে প্রথম বার রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। স্থানীয় সূত্রে খবর, সে দিন শাহজাদার বাড়িতে চড়াও হয়েছিলেন বেশ কিছু মানুষ। ওই বিক্ষোভে সামিল এক যুবকের কথায়, “আমাদের বলা হচ্ছিল, ভিতরে শাহজাদা নেই। কিন্তু মানুষ তা মানতে চায়নি। ভিতরে ঢুকে আমরা কয়েক জন দেখলাম সত্যিই সে নেই। ভিতরে বসে কড়েয়া থানার চার পুলিশকর্মী!”
ওই যুবকের অভিযোগ, “ওই পুলিশকর্মীরাই শাহজাদার স্ত্রীকে থানায় নিয়ে গিয়ে তাঁকে দিয়ে আমিরুলের বিরুদ্ধে ডাকাতির অভিযোগ লেখান। সে দিন শাহজাদার বাড়িতে কোনও ডাকাতিই হয়নি। কিছু মানুষ ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদে বিক্ষোভ দেখিয়েছিলেন। দরজা ভাঙা হয়েছিল। মানুষের দাবি ছিল, শাহাজাদাকে তাঁদের হাতে তুলে দিতে হবে।”
শাহজাদার পরিবারের ঘনিষ্ঠদের দাবি, আমিরুলের মৃত্যুর পরে পাড়ার অনেকে তাঁদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। তবে পুলিশের উপরে তাঁদের অগাধ আস্থা। পাম অ্যাভিনিউ, ব্রড স্ট্রিট এলাকার পুরনো বাসিন্দারা অনেকে বলেছেন, বছর বারো আগেও বামফ্রন্টের একটি শরিক দলের মিটিং-মিছিলে দেখা যেত শাহজাদাকে। একটি ডাকাতির মামলায় ছ’মাস জেল খাটার পর দলটি তাকে ত্যাগ করে (এখন অবশ্য দলটির দাবি, তাদের সঙ্গে শাহজাদার কখনওই কোনও সংস্রব ছিল না)। এলাকার মানুষের অভিযোগ, তার পর থেকেই গ্যারাজ-কর্মী শাহজাদার দেখভালের দায়িত্ব নেয় স্থানীয় পুলিশ।
শাহজাদা।
এ সব অভিযোগ নিয়ে কড়েয়া থানা কিংবা লালবাজার কিন্তু চুপ। রিজওয়ানুর-কাণ্ডের সময়ে কড়েয়া থানায় ছিলেন, এমন এক অফিসার মন্তব্য করেছেন, “তিন পুলিশকর্মীর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে। পাড়াতেও প্রতিবাদ হয়েছে। পুলিশ এখন শাহজাদার পাশে আর থাকবে না। এটাই নিয়ম।”
এ দিন আমিরুলের আইনজীবী নৌসাদ হুসেন বলেন, “ধর্ষণের অভিযোগ জানানোর পর থেকেই শাহজাদার লোকজন এবং কিছু পুলিশ তাকে হুমকি দিচ্ছিল বলে আমিরুল আমাকে জানিয়েছিল। এমনকী লালবাজার থেকে পুলিশের লোক এসে হুমকি দিয়েছিল বলেও জানিয়েছিল।” সব ঘটনাই মুখ্যমন্ত্রী, পুলিশ কমিশনার, মহিলা কমিশন এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে চিঠিতে জানানো হয়েছে বলে জানান ওই আইনজীবী।
এত জলঘোলা সত্ত্বেও হুমকি পিছু ছাড়েনি আমিরুলের পরিবারের। আমিরুলের বাবা জানান, বুধবার রাতে ছেলের শেষকৃত্য সেরে ফেরার পথেও তাঁদের আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে শাসিয়েছিল শাহজাদার লোকেরা। তাঁরা রাতেই কড়েয়া থানায় অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেন, “আমরা বিচার চাই। শাহজাদার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। শাস্তি চাই তিন পুলিশকর্মীর।”
অভিযুক্ত পুলিশকর্মীরা অবশ্য এ নিয়ে কিছু বলতে চাননি। অফিসার বিনোদ কুমার বলেন, “তদন্ত চলছে। আমিও চাইছি সঠিক তদন্ত হোক। তার আগে কিছু বলব না। আমি অসুস্থ, ছুটিতে রয়েছি।” কনস্টেবল নাসিম খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনও কথা বলতে চাননি। আর এক অফিসার রঞ্জিত যাদবের টেলিফোন বেজে গিয়েছে।
সুইসাইড নোটে আমিরুল লিখেছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর যেন শাহজাদার সঙ্গে পুলিশের আঁতাঁত নিয়ে প্রতিবাদ বন্ধ না হয়।
মৃত্যুর আগে রিজওয়ানুর রহমানের পাঠানো এসএমএসের সঙ্গে এই সুইসাইড নোটের মিল পেয়েছেন অনেকে। তাঁদের মতোই আমিরুলের সেই ‘আওয়াজে’ সাড়া দিয়েছেন রিজের মা কিশওর জহানও। তাঁর কথায়, “আমিরুলের প্রতি যা করা হয়েছে তা ঠিক নয়। পুলিশ একটু ঠিক করে কাজ করলে কিন্তু এই সব প্রতিবাদী ছেলেদের প্রাণ হারাতে হত না।” তবে আমিরুলের আইনজীবী জানিয়েছেন, কড়েয়া থানার নতুন ওসি এই ঘটনা নিয়ে ইদানীং যথেষ্টই সক্রিয়।

—নিজস্ব চিত্র
 
 
 


First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.