স্কুলে নিয়ে যাচ্ছে নাবালিকাদের
বিয়েতে না বলতে শেখাচ্ছে বিলকিস
ছোটবেলায় ‘খিচুড়ি স্কুলে’ (অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র) যাওয়া হয়নি।
ছ’-সাত বছর বয়সেই তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল লোকের বাড়িতে কাজ করতে। বছর চোদ্দোর সেই বিলকিস খাতুনই এখন গোটা পাড়াকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে স্কুলে।
শুধু কুচোকাঁচাদের নয়। সমবয়সী স্কুলছুটদের, এমনকী পাড়ার মাসিমা-কাকিমাদেরও। অথচ, তার নিজেরই বর্ণপরিচয় হয়েছে মোটে বছর আড়াই হল। ইতিমধ্যেই বিয়ের প্রস্তাবে সটান ‘না’ বলে দিয়েছে সে। নাবালিকা বন্ধুদেরও ‘না’ বলতে শেখাচ্ছে।
বর্ধমানের কাটোয়া শহর ছাড়িয়ে কিছু দূর গেলে গাঙ্গুলিডাঙা গ্রামের পূর্বপাড়া। পাড়ার বেশির ভাগ লোকই বাড়ি-বাড়ি ঘুরে লোহালক্কড়-পুরনো কাগজ কিনে আড়তদারের কাছে বিক্রি করেন। বিলকিসের বাবা শাহজামাল শেখও তেমনই এক জন। দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। ঘরে আছেন স্ত্রী আলেমা, মেয়ে বিলকিস, দুই ছেলে।
পুরুলিয়ার যে সাহসী মেয়েরা পড়া চালিয়ে যেতে চেয়ে কম বয়সে বিয়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল, সেই রেখা কালিন্দী, বীণা কালিন্দী বা আফসানা খাতুনদের কথা বিলকিস শোনেনি। শোনেনি বারো বছর বয়সে বিয়ে আর তেরো বছরে মা হয়ে যাওয়া বেবি হালদারের কথাও। ‘ভুল’ বিয়ে থেকে মুক্তি পেতে বাচ্চাদের হাত ধরে যিনি দিল্লির ট্রেনে চেপে বসেছিলেন। পরে পরিচারিকার কাজ করতে করতে যিনি লিখে ফেলেন সাড়া ফেলে দেওয়া আত্মজীবনী ‘আলো-আঁধারি’।
কিন্তু শুধু বিলকিস নয়। পূর্বপাড়ায় কেউই বোধ হয় এই সব নাম কখনও শোনেননি। এখনও সেখানে বেশির ভাগ বাড়িতে মেয়েদের পড়াশোনা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। এখানে বছর বারো-তেরো মানেই মেয়ে ‘অনেক বড়’। তার বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু কম বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়া দুই দিদির হাল, তাদের হতাশা যে নিজের চোখে দেখেছে বিলকিস!
বিলকিস খাতুন ছবি: অসিত বন্দ্যোপাধ্যয়
বছর ছয়েক বয়স থেকে বীরভূমের বোলপুরে আত্মীয়ের বাড়িই ছিল বিলকিসের ঠিকানা। সেখান থেকেই এর-ওর বাড়িতে কাজে যাওয়া। বছর আড়াই আগে এক দিদির বিয়ের সময়ে বিলকিস পাকাপাকি ভাবে নিজের গ্রামে ফেরে। ভর্তি হয় বাড়ি লাগোয়া শিশু শিক্ষাকেন্দ্রে। আলোর জানলা খুলে যায়।
কিন্তু অভাবের সংসারে কালো মেঘও যে ধারে-কাছেই ওত পেতে থাকে। হঠাৎই অচেনা মুলুক থেকে এসে হাজির পাত্র। মেয়ের বিয়ে দিলে কড়কড়ে কয়েক হাজার টাকা গুনে দেবে সে। বিলকিসের বাবার কাছে তা অনেক। নিজেই মানছেন, তাঁর মনের জোর ছিল না, সেই প্রস্তাব ফেরান।
কিন্তু বিলকিসের মন মানেনি। বিয়ের ঠিক আগেই সে জানিয়ে দেয় ‘আগে পড়াশুনো, তার পরে ঠিক বয়সে নিকাহ্।’
শাহজামাল-আলেমা বলেন, “মেয়ের জেদের কাছে আমাদের হার মানতে হয়। ওর এই জেদ যেন নষ্ট না হয়, সেটাই চাই।” শুধু তাঁরা নন, পূর্বপাড়ার অনেক অভিভাবকই এখন মেয়েদের এমন জেদের কাছে হার মানছেন। সৌজন্যে, বিলকিস। ছবি বিবি নামে এমনই এক অভিভাবিকার কথায়, “আমার স্বামী নেই। মাদুর বুনে সংসার চালাই। গত বছর মেয়ের বিয়ে দেব ঠিক করেছিলাম। কিন্তু বিলকিস এসে বলল, ‘আঠারো বছরের কম বয়সে বিয়ে দেওয়া ঠিক নয়’। মেয়েও পড়তে চাইল। এখন কষ্ট করে হলেও মেয়েকে পড়াব।’’
বিলকিস নিজে নিয়মিত স্কুলে যায়। সঙ্গে নিয়ে যায় এলাকার প্রায় সব ছেলেমেয়েকে। প্রশাসনের হিসেবে পূর্বপাড়ার কোনও ছেলেমেয়ে এখন ‘স্কুলছুট’ নেই। পাড়ার মর্জিনা বিবি, আনহারা বিবিরা বলেন, “কেউ স্কুলে যাচ্ছে না খবর পেলেই বিলকিস তার বাড়ি পৌঁছে যাবে। খোঁজ নেবে বাচ্চাটা কেন যাচ্ছে না। প্রয়োজনে বাড়ির লোকেদের সঙ্গে তর্ক করে বা বুঝিয়ে তাকে ফের স্কুলমুখো করিয়ে ছাড়বে।”
শুধু ছোটদের জন্য নয়, বড়দের বেলাতেও একই ‘নিয়ম’ বিলকিসের। স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলাদের জন্য প্রতিদিন বিকেলে স্কুল বসে। কিন্তু সেই মহিলাদের অনেকেই বাড়ির কাজ ফেলে স্কুলে যেতে নিমরাজি ছিলেন। নাছোড় বিলকিস হার মানিয়েছে তাঁদেরও। তসমিনা বিবি, আলিয়া বিবিদের কথায়, “বিকেল ৩টে বাজলেই বিলকিস এমন তাড়া দেয় যে বইপত্র নিয়ে স্কুলে যেতে বাধ্য হই।” গোটা পাড়াকে এ ভাবে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার প্রাণশক্তি আসে কোথা থেকে? চকচকে চোখে বছর চোদ্দোর মেয়েটি বলে, “কম বয়সে বিয়ে হওয়ায় আমার দুই দিদি নানা ধরনের কষ্ট পেয়েছে, নিজের চোখে দেখেছি। তা দেখে আমার বাবা-মাও কষ্ট পেয়েছেন। তাই বিয়ে না করে পড়তে চেয়েছি। সমবয়সীদেরও বলেছি, আমি যদি পারি, তোরা পারবি না কেন?”
পূর্বপাড়া শিশু শিক্ষাকেন্দ্রের মুখ্য সহায়িকা জয়ন্তী মল্লিক বলেন, “এ রকম একটি মেয়ে আমাদের স্কুলে আসায় আমরা গর্বিত। ও শুধু নিজে সাহস দেখায়নি, সমবয়সীদের মধ্যেও তা ছড়িয়ে দিয়েছে। ওর কথা লিখিত ভাবে ব্লক প্রশাসনকে জানিয়েছি।” ওই কেন্দ্রের সম্পাদক তথা স্থানীয় মাদ্রাসার শিক্ষক শেখ মহম্মদ আবু সিদ্দিকির মতে, “বিলকিসের ভূমিকা ঘরে ঘরে বললে স্কুল ছুটদের ফেরানো সহজ হবে।’’ কাটোয়া-১ ব্লকের বিডিও আশিসকুমার বিশ্বাস বলেন, “ওই মেয়েটা দৃষ্টান্ত। ও যাতে স্বীকৃতি পায়, আমরা সেই চেষ্টা করছি।”
পূর্বপাড়ার অনেক বাড়িতেই এখনও বিদ্যুৎ পৌঁছয়নি। বিলকিসই সেখানে পুবের আলো।



First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.