আগে তো হিন্দুস্তানে এসো, আলিপুর জেল
থেকে করাচিতে স্ত্রীকে ফোন আফতাবের
গাঁধীজি যেখানে মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে, জায়গাটা তার পাশেই। সদর দরজা থেকে সাকুল্যে মিনিট তিনেকের হাঁটাপথ। রাত তখন ১১টা বেজে গিয়েছে। আলিপুর সেন্ট্রাল জেলের ওই ‘সলিটারি সেল’-এর এক আসামি দামী একটি মোবাইল সেট বের করে ফোন করল প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার পশ্চিমে থাকা অন্য একটি সেলফোন নম্বরে। এক বার বাজার সঙ্গে সঙ্গেই ও প্রান্তে ফোন ধরলেন আয়েশা ওরফে সীমা আনসারি।
কী হল, আজ সকালেও তো ফোন করার কথা ছিল?
না, না, আজ কড়াকড়ি ছিল। মোবাইলটা তখন হাতেই পাইনি।
দুশ্চিন্তা হচ্ছিল। যাক গে, যে ভাবে বলেছিলে, সে ভাবেই কাজ এগোচ্ছে।
তাড়াতাড়ি করো। তবে ঘুণাক্ষরেও যেন তোমার বা আরশালের পাসপোর্টে আমার পরিচয় না-থাকে। তা হলে কখনও ইন্ডিয়ার ভিসা পাবে না।
ঠিক আছে। অদ্ভুত লাগছে। জন্ম হওয়া ইস্তক ছেলেটা কোনও দিন বাবাকে দেখতেই পায়নি। ১০ বছর হয়ে গেল ওর।
সব হবে। আগে তো হিন্দুস্তানে এক বার ঢুকে পড়ো। এখন রাখছি। ভাল থেকো। সাবধানে কাজ করবে।
কোনও কাহিনি বা বলিউডি চিত্রনাট্য নয়। এ কঠোর বাস্তব। যার স্থান কলকাতায় আলিপুর সেন্ট্রাল জেল। এবং আসামি চরিত্রটি আর কেউ নয়, কলকাতায় আমেরিকান সেন্টারের সামনে জঙ্গি হানা ও খাদিম কর্তা অপহরণের ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত জঙ্গি আফতাব আনসারি। ফাঁসির আসামি। এই ফোনের কথোপকথনও হঠাৎ কোনও এক দিনের ঘটনা নয়। আনসারি এখন প্রায় রোজ রাতে নিয়ম করে আলিপুর জেল থেকে অবাধে ফোন করে করাচিতে তার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলছে বলে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ইনটেলিজেন্স ব্যুরো (আইবি)-র দাবি। গোয়েন্দাদের বক্তব্য, মাঝেমধ্যে সকালেও কথা হচ্ছে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে। আফতাবের মোবাইলে আড়ি পেতে সম্প্রতি গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন, তার স্ত্রী ও ছেলে পাকিস্তান থেকে যত শীঘ্র সম্ভব ভারতে ঢোকার তোড়জোড় করছে। পাসপোর্ট-ভিসা নিয়েই। আলিপুর জেলে বসে গোটা ছকটাই সাজিয়েছে আফতাব স্বয়ং।
জঙ্গির মুখ। ফেসবুকে আফতাব আনসারির প্রোফাইল ছবি।
কী ভাবে? গোয়েন্দারা জেনেছেন, মোবাইল মারফতই জেলে বসে আফতাব তার স্ত্রী সীমাকে নির্দেশ দিচ্ছে, ভারতে ঢোকার জন্য পাকিস্তানে কাদের কাছ থেকে সাহায্য পাওয়া যাবে। গোয়েন্দাদের বক্তব্য, মোবাইলে জেল থেকে করাচিতে স্ত্রীর সঙ্গে এর আগেও কথা বলেছে আফতাব। কিন্তু তখন সে এত ঘন ঘন কথা বলত না। আসলে স্ত্রী-পুত্রকে তড়িঘড়ি ভারতে আনতে আফতাব উদ্যোগী হয়েছে বলেই এখন সে রোজ রাতে নিয়ম করে আয়েশার সঙ্গে কথা বলছে বলে মনে করছেন গোয়েন্দারা।
ফাঁসির আসামি হয়ে জেলে বসে যে অনায়াসে পাকিস্তানে থাকা স্ত্রীর সঙ্গে মোবাইলে নিয়মিত কথা বলতে পারে, সেই ব্যক্তি আর কী কী করতে পারে, তা ভেবে আশঙ্কায় থই পাচ্ছেন না গোয়েন্দারা।
শুধু আইবি নয়, বিষয়টি জানতে পেরেছে কলকাতা পুলিশের স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ)-ও। রাজ্যের কারা দফতরের ইন্সপেক্টর জেনারেল রণবীর কুমারের কথা থেকেই তা জানা গিয়েছে। তিনি বলেন, “আফতাব যে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে নিজের সেলে বসে মোবাইল ফোনে করাচিতে তার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলছে, সে কথা এসটিএফ সম্প্রতি আমাদের জানিয়েছে।” তবে আফতাব যে রোজ রাতে কথা বলছে, সেটা তাঁরা এর আগে জানতেন না বলে কবুল করেছেন আইজি (কারা)। তাঁর বক্তব্য, “সাধারণত ঠিক যে-সময়ে আফতাব করাচিতে ওই ফোনটা করে, তখন আচমকা কলকাতা পুলিশ ও কারারক্ষীরা যৌথ ভাবে ওর সেলে হানা দিলে ওকে হাতেনাতে ধরা যেতে পারে। কোন সময়ে আনসারি ফোন করছে, এসটিএফ সেটা জানালে ব্যবস্থা নিতে পারি।”
আলিপুর জেলে এর আগে পুলিশ ও কারারক্ষী বাহিনী যৌথ ভাবে তল্লাশি অভিযান চালিয়েছে। প্রচুর মোবাইলও উদ্ধার হয়েছে। কিন্তু বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে আফতাব আনসারির গোপন ও বিপজ্জনক যোগাযোগ বন্ধ করা যায়নি। তা হলে কি কারারক্ষীদের একাংশ আফতাবের মতো অতি বিপজ্জনক কয়েদির সঙ্গে বরাবর যোগসাজস করে চলছে?
আইজি (কারা) বলেন, “সেটা ঠিক নয়। আফতাবের মতো অপরাধীরা জেলে কিছু না-করে চুপচাপ বসে থাকবে, সেটা তো সম্ভব নয়। ওরা অত্যন্ত ধূর্ত। আমরা বিভিন্ন ভাবে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিলেও ওরা ঠিক তার মধ্যে ফাঁকফোকর বের করে ফেলছে।” কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা মারফত এই খবর পেয়ে দিল্লিতে নড়েচড়ে বসেছে স্বরাষ্ট্র ও বিদেশ মন্ত্রক। কোনও ভাবেই যাতে আফতাবের স্ত্রী ও ছেলে ভারতে আসার ভিসা না-পান, সেই ব্যাপারে তৎপর হয়েছে দিল্লি। সেই সঙ্গে ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা ‘র’ (রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং) আয়েশা ও আরশালের এখনকার ও আগেকার বিভিন্ন ধরনের ছবি সংগ্রহ করছে। যাতে ভুয়ো নাম বা পরিচয়ে পাসপোর্ট করালেও ধরে ফেলা যায়। বছর কয়েক আগে আয়েশা তাঁর শিশুপুত্রকে নিয়ে ভারতে আসার জন্য ভিসার আবেদন করেছিলেন। কিন্তু তা মঞ্জুর হয়নি। এ বার তাঁদের তৎপরতার খবর পেয়ে গোয়েন্দাদের মনে হচ্ছে, ভুয়ো নামে তাঁরা ভিসার আবেদন করতে পারেন।
হ্যালো করাচি
• দামি মোবাইল ব্যবহার
• স্ত্রীকে ফোন করে পাকিস্তান থেকে আনার চেষ্টা
• আনার চেষ্টা ছেলেকেও
• ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট
কিন্তু আফতাবের স্ত্রী কোনও ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত নন। ছেলেও নাবালক। তা হলে দু’জনকে ভারতে ঢুকতে দিতে অসুবিধে কোথায়?
কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার এক অফিসার বলেন, “একে জেলের মধ্যে বসেই আফতাব পাকিস্তানে ফোন, জঙ্গি নেটওয়ার্কের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা সব কিছুই করতে পারছে। এর পর ওর স্ত্রী ভারতে ঢুকলে সমস্যা আরও বাড়বে। ওঁকে তো আমরা শুধু শুধু আটক বা গ্রেফতার করতে পারব না। ওই মহিলা যদি স্বামীর সঙ্গে জেলে গিয়ে দেখা করতে চান, তা হলেই আমরা বাধা দেব কী ভাবে?”
আইবি-র ওই অফিসারের বক্তব্য, “আফতাবের স্ত্রী এক জন পাক নাগরিক। পাকিস্তানি জঙ্গিদের হয়ে তিনি এখানে কাজ করবেন না, তার গ্যারান্টি কোথায়? যেখানে জেলের মধ্যে বসেই তাঁর স্বামী ভয়ঙ্কর সব কাণ্ড ঘটাচ্ছে, সেখানে ওই মহিলার উপর আমরা কত নজরদারি করব? উনি এখানে চলে এলে আফতাবের কাজ অনেক সহজ হবে।” তাঁর কথায়, “সে ক্ষেত্রে আমাদের ঘাড়ে নতুন সমস্যা চাপবে।”
গোয়েন্দারা জেনেছেন, করাচি শহরে স্থায়ী বসবাস হলেও সেখানে ঘন ঘন জায়গা বদল করে থাকেন আফতাবের স্ত্রী ও ছেলে। কখনও আয়েশার মোবাইল, কখনও বা ল্যান্ডলাইন, দু’টোতেই তাঁর স্বামীর ফোন যায় আলিপুর সেন্ট্রাল জেল থেকে। আফতাবই সব সময়ে ফোন করে। এবং সে জন্য সে একাধিক মোবাইল সেট ও সিম কার্ড ব্যবহার করছে বলে গোয়েন্দাদের দাবি। আফতাব এক বারে সাধারণত তিন-চার মিনিটের বেশি সাধারণত স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে না।
২০০২-এর ২৩ জানুয়া শুধু করাচিতে পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখাই নয়, জেলে বসে মোবাইল ফোন ব্যবহার করে ফেসবুকে নিজের অ্যাকাউন্ট-ও খুলে ফেলেছে আফতাব। গোয়েন্দাদের দাবি, আফতাবের যে-ছবিটি ফেসবুকে তার ‘প্রোফাইল পিকচার’ করা হয়েছে, সেটি জেলে তার নিজের সেলের মধ্যেই মোবাইলে তোলা। অন্তত এক বছরেরও বেশি সময় আগে আফতাব এই ভাবে জেল থেকে সাইবার দুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করে ফেললেও গোয়েন্দারা এ বছর অগস্ট মাসের আগে তা জানতে পারেননি। কিন্তু অ্যাকাউন্ট-এর ধরন এমনই যে, আফতাবের ফেসবুক-বান্ধবরা ছাড়া ওই অ্যাকাউন্ট-এর তথ্য অন্য কেউ দেখতে পারবেন না। গোয়েন্দারাও এখনও পর্যন্ত পারেননি।
 
 
 


First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.