...ঢাকে পড়ল কাঠি: স্মৃতি ও সত্তা
ঠিক কেমন দেখতে ছিল সাবেক বাংলার দেবীর চালি? কেমন দেখতে মঠচৌড়ি ও টানাচৌড়ির চালি? পাড়ায় পাড়ায় যখন চলেছে থিম পুজোর টেক্কা দেওয়ার প্রস্তুতি তখনই বনেদি বাড়িতে অনেকটা নজরের আড়ালেই গড়ে উঠছে সাবেক রীতির নানা চালি।
সাবেক চালির আকৃতির রয়েছে বেশ কয়েকটি ভাগ। যেমন বাংলা চাল, খোপচাল, টানাচৌড়ি, মঠচৌড়ি ও মার্কিনিচাল। প্রবীণ মৃৎশিল্পীদের মতে সাবেক বাংলা চালের ঢাল একেবারে কার্তিক-গণেশ পর্যন্ত নামত। অন্য দিকে ছিল খোপ চালও। আর ছিল মঠচৌড়ি ও টানাচৌড়ি। তবে কিছু গবেষকের মতে মঠচৌড়ি ও টানাচৌড়ির মধ্যে পার্থক্য সামান্যই। দুর্গাপ্রতিমার পিছনে মঠের চূড়ার মত তিনটি চালি থাকলে তাকে বলে মঠচৌড়ি। আর টানাচৌড়ির ক্ষেত্রে দুর্গা, লক্ষ্মী ও সরস্বতীর মাথার পিছনে থাকে তিনটি অর্ধবৃত্তাকার ছোট চাল। তার ঠিক উপরেই থাকে মঠের চূড়ার আকৃতির তিনটি চাল।
তবে বর্তমানে বেশির ভাগ বনেদি বাড়ির পুজোয় যে চালচিত্র দেখা যায় তাকে বলে মার্কিনিচাল। এই চালি সরস্বতী ও লক্ষ্মী পর্যন্ত এসে শেষ হয়ে যায়। কার্তিক-গণেশ থাকে চালির কিছুটা বাইরে।
দর্পনারায়ণ ঠাকুর স্ট্রিটের বৈষ্ণবদাস মল্লিকের বাড়ি
শুধু আকৃতি নয়, তার উপর যে চালচিত্র থাকত তার জন্যও চালির ভিন্ন ভিন্ন নামকরণ হত। যেমন বৃন্দাবনী, রামচন্দ্রী, দশাবতারী ইত্যাদি। তবে গত শতকে সব চেয়ে প্রচলিত ছিল কৈলাসী চাল। কৈলাসী চালের মাঝে থাকেন মহাদেব। আর তাঁর পাশে থাকেন পার্বতী, কালী, ব্রহ্মা, কৃষ্ণ। আর থাকে চণ্ডীর নানা কাহিনিও।
চালি ঐতিহ্যের নানা কথা শোনা গেল কুমোরটুলির প্রবীণ শিল্পী নিরঞ্জন পালের মুখে। তিনি বললেন, “কুমোরটুলিতে গোপেশ্বর পালই প্রথম প্রথা ভেঙে একচালার প্রতিমার পরিবর্তে পাঁচটি আলাদা চালির প্রতিমার প্রবর্তন করেছিলেন। বর্তমানে কাগজের উপর পট আঁকা হলেও আগে এমনটা ছিল না। পট লেখার আলাদা শিল্পী ছিলেন। পট আঁকা কেউ বলত না। তাঁরাই বাড়ি বাড়ি গিয়ে পট লিখতেন চালিতে। চালির আকারও হত নানা রকম। শুধু বাংলা চাল বা মঠচৌড়ি কেন? ছিল নানা রকমের চাল। সেগুলি আজ লুপ্ত। যেমন গির্জাচাল, সর্বসুন্দরী চাল, দোথাকি চাল ইত্যাদি। সে যুগে অনেক ভাল কারিগর ছিলেন। বাখারি দিয়ে তাঁরা অনেক সূক্ষ্ম কাজ করতে পারতেন। আজ আর সেটা সম্ভব নয়। তাই হারিয়ে গেছে গির্জাচাল, সর্বসুন্দরী চাল ও দোথাকি চালও।”
দর্জিপাড়া মিত্রবাড়ির (রাজকৃষ্ণ মিত্রের বাড়ি) দুর্গাপ্রতিমার চালি মঠচৌড়ি। দুর্গা, লক্ষ্মী ও সরস্বতীর মাথার দিকে থাকে তিনটি অর্ধবৃত্ত। এই অর্ধবৃত্তের ঠিক উপরেই থাকে তিনটি মঠের চূড়ার আকৃতির চালি। এই চালিতে থাকে মাটির নানা রকম নকশা ও অপরাজিতা ফুল। লক্ষ্মী ও সরস্বতীর দুপাশে থাকে দুটি টিয়া পাখি ও মকরের মুখ। তবে বিশেষ উল্লেখযোগ্য, লক্ষ্মী ও সরস্বতীর ঠিক পিছনে থাকে কুলুঙ্গি। আর এই কুলুঙ্গির মধ্যে লক্ষ্মীর পিছনে থাকে রামচন্দ্র ও হনুমানের ছোট মূর্তি ও সরস্বতীর পিছনে থাকে ষাঁড়ের পিঠে শিবের মূর্তি। চালচিত্রেও থাকে বৈচিত্র। এই পরিবারের অনসূয়া বিশ্বাস জানালেন, দুর্গার উপরের চালিতে আঁকা হয় ত্রিপুরাসুন্দরীকে। এ ছাড়াও লক্ষ্মীর চালিতে আঁকা হয় কালী ও সরস্বতীর চালিতে আঁকা হয় জগদ্ধাত্রীর ছবি।

জানবাজারের রানি রাসমণির বাড়ি

ঝামাপুকুর চন্দ্রবাড়ি
জানবাজারের রানি রাসমণির বাড়ির দুর্গাপ্রতিমা আকারে বেশ বড়। সাবেক বাংলা চালের প্রতিমা আর প্রতিটি প্রতিমার মুখ ছাঁচবিহীন হাতে গড়া। নির্মাণ করেন বীরভূমের আমেদপুরের শিল্পী লালু চিত্রকর। চালিতে থাকে বৈচিত্র। আঁকা হয় পুরাণ ও চণ্ডীর নানা কাহিনি। এ ছাড়াও থাকে রামায়ণ ও কৃষ্ণলীলার বিভিন্ন দৃশ্য। ঝামাপুকুর চন্দ্রবাড়ির পুজোয় সাবেক বাংলা চালিতে কুলুঙ্গির মধ্যে থাকেন শিবের কোলে দুর্গা। চালির পটের মাঝখানে আঁকা থাকে মহিষমর্দিনী। কিন্তু বৈষ্ণব পরিবার বলে চালচিত্রেও থাকে কৃষ্ণলীলার নানা দৃশ্য। হাটখোলার দত্তবাড়িতে মঠচৌড়ির চালিতে থাকে মাটির কলকা-সহ নানা অলঙ্করণ। চালির পটে থাকে দশমহাবিদ্যার দশটি রূপ।
দর্পনারায়ণ ঠাকুর স্ট্রিটের বৈষ্ণবদাস মল্লিকের বাড়ির পুজোয় দেখা যায় সাবেক বাংলার চালি। পুরনো প্রথা মেনে আজও আঁকা হয় চালচিত্র। চালচিত্রের মাঝখানে দালানের মধ্যে থাকেন মহিষমর্দিনী। থাকে দশমহাবিদ্যা ও দেবীর অষ্টশক্তির রূপ। চালির দুই প্রান্তে দেখা যায় চণ্ডীতে বর্ণিত দুর্গা ও কালীর অসুরদের সঙ্গে যুদ্ধের দৃশ্য। রাম-সীতা ও কৃষ্ণলীলার দৃশ্যও থাকে। আর চালির মধ্যে দুপাশে থাকে বিষ্ণুপুরাণ ও রামায়ণের নানা ছবি। এখানে দুর্গা প্রতিমার দুটি চোখ। কুলুঙ্গির মধ্যে শিবের কোলে থাকেন দুর্গা। দেবীর পায়ের কাছে থাকে দুটি সিংহ। এ ছাড়াও থাকেন জয়া-বিজয়া। দুর্গার চেয়ে লক্ষ্মী-সরস্বতী আকারে বড়।
দর্জিপাড়া মিত্রবাড়ি
তবে থিম পুজোতেও বাদ পড়েনি বাংলার চালি। হারিয়ে যাওয়া বিভিন্ন আকৃতির চালি ও শিল্পীর কল্পনা নিয়েই কালীঘাট সঙ্ঘশ্রীর পুজোর থিম ‘এ চিত্র সে চিত্র চালচিত্র’। তাই পুজোর মণ্ডপও চালির আকৃতির।
এখন প্লাস্টিকে ছাপা আলপনার মতোই পাওয়া যায় ছাপা চালচিত্র বা পটও। প্রতি বছরই নাকি কমতে থাকে সাবেক চালি শিল্পী। কে জানে, অদূর ভবিষ্যতে চালি ও চালচিত্র হয়তো থেকে যাবে শুধু বইয়ের পাতায়।




অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.