পুস্তক পরিচয় ১...
বাঙালি জীবনে যা কালচার তাই নেচার
বাংলার মন্দির, হিতেশরঞ্জন সান্যাল। কারিগর, ৩৮০.০০
নেচার আর কালচার, প্রকৃতি আর কৃষ্টি, কুটুম আর কাটাম্। আমাদের চার পাশে কুটুমের মতোই তো প্রকৃতি ছড়িয়ে আছে, তারা কাছে আসে, যায়, থাকে। কিছু গড়ে তোলার উপাদান তো সেখান থেকেই বাছি, আর হাতের ছোঁয়ায় সেগুলিকে শিল্পদ্রব্যে বানিয়ে তুলতে পারলেই সব মিলিয়ে হয়ে ওঠে এক কুটুম-কাটাম্। মানব কৃষ্টিতে তো নিয়ত কুটুম-কাটামের কাজ চলছে। বাঙালি সংস্কৃতির এক পর্বে, ত্রয়োদশ থেকে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত, নেচার ও কালচারের অন্বিত রূপ যে বাংলার মন্দির, এই বিষয়ে অকালপ্রয়াত ঐতিহাসিক হিতেশরঞ্জন সান্যালের সন্দেহ ছিল না। এই অন্বিত রূপটি ঐকান্তিক ভাবে বাঙালি ‘জাতীয় কর্মপ্রচেষ্টার’ কী বিশেষ রূপে কী প্রকরণে সিদ্ধ হল, সেই বিষয়টি এই প্রবন্ধগ্রন্থের অন্বিষ্ট। প্রায় চার দশক আগে সমকালীন, দেশ, চতুরঙ্গ ইত্যাদি পত্রিকায় বিক্ষিপ্ত ভাবে প্রকাশিত এই প্রবন্ধগুলি বাংলার মন্দিরের শৈলীগত বিভাজন ও ক্রমপরিবর্তনের ধারাকে তুলে ধরেছিল। তাঁর গবেষণা অভিসন্দর্ভ টেম্পল বিল্ডিং অ্যাকটিভিটিজ ইন বেঙ্গল: এ সোশ্যাল স্টাডি (১৪৫০-১৯৬০), আজও অপ্রকাশিত। ওই সন্দর্ভটির অভাব এই প্রকীর্ণ প্রবন্ধ সংকলন আংশিক ভাবে পূরণ করবে, এই আশা করা যায়।
একাধারে নির্মলকুমার বসু ও নীহাররঞ্জন রায়ের সারস্বত সাধনার উত্তরসূরি হিতেশরঞ্জন সান্যাল। ক্যাননস অব ওড়িশান আর্কিটেকচার বা কোনারকের মন্দিরের উপর নির্মলকুমারের আলোচনার ধাঁচে মন্দির সমূহের অবয়ব সংস্থানে হিতেশরঞ্জন আগ্রহী। ভিত্তি, বাড়, গণ্ডি, শিখর ইত্যাদি প্রতিটি অঙ্গের মাপজোখ ও আকৃতির বৈশিষ্ট্য, একই অঞ্চলের মন্দিরের সঙ্গে অন্য অঞ্চলের সমগোত্রের মন্দিরের অবয়ব সংস্থানে ফারাক কতটুকু, সেটাও তাঁর চোখ এড়ায় না। এই দৃষ্টি পরিসর থেকে আদান-প্রদানের এক বৃত্তান্ত বেরিয়ে আসে। বাংলায় কী ভাবে প্রতিবেশী ওড়িশার প্রচলিত শিখর রীতি নিজস্ব গতিতে ছড়িয়ে পড়ে একটু বদলে গেল, আবার সেই রীতির পাশাপাশি ‘বাঙালি জাতির নিজস্ব স্থাপত্য ভাবনার ফল’ চালা রীতি বিকশিত হল, দোচালা থেকে আটচালায় রূপ পেল, তার ঐতিহাসিক বিবৃতি তিনি কাঠামো ও অবয়বের বর্গে আলোচনা করেছেন। একটি ছোট অংশে ‘বংগালি ছত্রী’ সারা উত্তর ভারতে কী ভাবে আদৃত হল, সেই প্রসঙ্গও ছুঁয়ে যাওয়া হয়েছে। সবশেষে, সার্বভৌম ভারতীয় সংস্কৃতির পথে শিখর রীতি আর বাংলার নিজস্ব চালারীতির মিশ্রণে ‘রত্নরীতি’র উদ্ভব, আর এই মিশ্রণে ভারসাম্য বজায় রাখা ও ‘মূলগত কৃত্রিমতা’ অতিক্রম করাই যে বাংলার স্থপতিদের অন্যতম মৌল সমস্যা ছিল, সেই আলোচনাতেই তার কাঠামোগত বিশ্লেষণ শেষ হয়েছে।
সর্বভারতীয় রীতি ও আঞ্চলিক রীতির ছেদ ও প্রতিচ্ছেদের কথা বাংলার মন্দিরের ইতিহাসে আজ কারও সে ভাবে অজানা নয়। তারাপদ সাঁতরা, ডেভিড ম্যাককাচ্চন, চিত্তরঞ্জন দাশগুপ্ত ও পিকা ঘোষের লেখাতেও আলোচনা আছে। তবে চার দশক আগে এই ধরনের আলোচনার অন্যতম পথিকৃৎ হিতেশরঞ্জনের রচনায় নিজস্ব মশলার ফোড়ন আছে, স্বাদে তা আজও অনতিক্রান্ত। মন্দির নির্মিতিতে স্থানীয় সহজলভ্য উপাদানের ব্যবহার কী ভাবে মন্দির প্রকরণকে বৈশিষ্ট্যে মণ্ডিত করেছে সে সম্পর্কে অনুপুঙ্খ মন্তব্য রচনার নানা স্থানে ছড়িয়ে আছে। ইট বা মাকরা পাথরের ব্যবহার চালা ঘরের আকার থেকে চালা মন্দিরের সংস্থানে কতটুকু বৈষম্য কী ভাবে এনেছিল, তার নিখুঁত রৈখিক হিসেবনিকেশ তিনি করেছেন। চালা মন্দিরের প্রকরণে ফুলপাথর নামে স্থানীয় গাঢ় পাটলরঙের অত্যন্ত নরম পাথর কেটে কোমল মসৃণ রূপ পরিণাম ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল, সেই কৌশলের বিবরণ মল্লারপুরের গণপুর গ্রামের মন্দিরাবলির আলোচনায় ধরা পড়েছে। প্রাকৃতিক খবর চোখ এড়ায় না পরিত্যক্ত অবহেলিত মন্দিরকে যে সময় সময় বহু বিস্তৃত বট ও অশ্বত্থ শিকড়ই ধরে রাখে, এই তথ্যটির দৃষ্টান্ত রূপে শান্তিপুরের বাঘআঁচড়া গ্রামে চাঁদ রায়ের মন্দিরের কথাটি তিনি মনে করিয়ে দেন। ঘি দিয়ে ভাজলে ইট মজবুত হয়, এই লৌকিক জনশ্রুতিও তিনি জানাতে কসুর করেন না। খবরগুলি টুকরো, বিক্ষিপ্ত, কিন্তু রীতি বিবর্তনের আখ্যানে গ্রথিত। ফলে রচনাশৈলীতে অতীতের সঙ্গে সরাসরি সান্নিধ্যের আভাস আসে, বাচনিক বিন্যাসেই সিন্ধুর মধ্যে কয়েকটি বিন্দু আপন বৈশিষ্ট্যে ঝলমল করে। যে কোনও গবেষণায় সান্নিধ্যের এই স্বাদটুকু দুর্লভ।
বাঙালির সংস্কৃতির ইতিহাসচিন্তার কালক্রমের বিচারে নীহাররঞ্জন রায়ের বক্তব্যের অনুগামী হিতেশরঞ্জন শিক্ষকের মতো তিনিও মনে করেন যে অষ্টম থেকে ষোড়শ শতকের মধ্যেই বাঙালি সত্তার প্রতিষ্ঠা হয়, আঞ্চলিক বাঙালি সংস্কৃতির উন্মেষ ও বিকাশের যুগ সেই পর্বে। মোগল শাসনের ক্রমবর্ধমান আধিপত্যে সপ্তদশ শতক হতেই স্থাপত্য সংস্কৃতিতে সৃজনশীলতার অবক্ষয় হয়, অষ্টাদশ শতক তো অধঃপতনের যুগ। সপ্তদশ শতকে বহির্জগতের সঙ্গে আদান-প্রদান ফলপ্রসূ হয়নি, মল্লভূমের অভিজ্ঞতা একেবারে ব্যতিক্রম।
‘সৃজনশীলতা’, ‘অবক্ষয়’ এ সব শব্দই তো বৈচারিক, মূল্যবোধ ও রাজনীতিতে সিক্ত। দেশজ সংস্কৃতির উদ্যোগ যদি বহিঃপ্রভাবকে আত্মস্থ না করতে পারে, তবে সেই প্রভাব আড়ম্বরপূর্ণ হলেও অনান্দনিক, চোখে সয় না। চালারীতি বাংলার প্রকৃতি তথা গার্হস্থ্য জীবনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, আদৌ চাপানো নয়, বরং সামাজিক উদ্যোগে আড়াআড়ি ভাবে বাংলার দেবদেউলে আকার পেয়েছে। আমদানি করা শিখর রীতি যেখানেই চেপে বসেছে, সেখানেই উর্ধ্বাংশের সঙ্গে নিম্নাংশ খাপ খায়নি, অধিকাংশ মন্দির-সংস্থানই বেখাপ্পা লেগেছে। বাংলার বেশ কিছু মন্দিরে দেহগত গঠনের অসঙ্গতি ভাবগত বন্ধন দিয়ে ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। এই ভাবগত রূপ বৈষ্ণব সাহিত্য, পট ও লোকজীবন কল্পনা থেকে জাত। কিন্তু প্রায়শই রত্নরীতির উচ্চতা জাহির করার চেষ্টা পরিপার্শ্বের সামঞ্জস্যকে ব্যাহত করেছে, আকৃতির অসঙ্গতি ভাবের অলংকরণে ঢাকা পড়েনি।
হিতেশরঞ্জন গাঁধীবাদী। গণ সমন্বয়, গণ উদ্যোগ ও পরিপার্শ্বকে ঘিরে স্বরাজের চেতনাকে ইতিহাস-চর্চায় প্রতিষ্ঠিত করার আদর্শে তিনি অনড়, তাঁর নান্দনিক বিচারের মাপকাঠিও সেই চৈতন্যে স্থিত। সমস্ত আলোচনায় এক বারই তিনি তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাকে অ্যানেকডোট বা কথা-কণিকারূপে ব্যবহার করেছেন, ওই কথা-কণিকাতেই তাঁর আলোচনার উপস্থাপনটি শেষ হয়েছে। হালিশহরে নন্দগোপাল-জিউয়ের মন্দিরে বিধবা সেবায়েতের কষ্টিপাথরের গোপালের ছবি লেখক তুলেছিলেন। বাইরে রোদের আঁচ থেকে পাথরের গোপালকে বাঁচাবার জন্য বিধবা মহিলাটি আঁচল দিয়ে বিগ্রহকে ঢাকা দিয়েছিলেন, একটু কষ্ট সহ্য করার জন্য স্নেহের গোপালকে কত আদরের উক্তি করে প্রবোধ দিয়েছিলেন।
হিতেশরঞ্জনের বিবেচনায় বাঙালির এ হেন দেবকল্পনা একেবারে পারিবারিক পরিবারের কেউ মারা গেলে ইষ্টদেবতা গোপালও কাছা নেন, এই কথা তো দীনেশচন্দ্র সেনও কত দিন আগে জানিয়েছেন। এই গার্হস্থ্য ধারণাকে ঘিরে মন্দির স্থাপত্যের যে ভাবনা গড়ে ওঠে, তা গৃহস্থের বাসগৃহকেই মডেল করে, চালারীতির মন্দিরই বাঙালির ‘প্রাণের ঠাকুরের’ পছন্দসই ঠাঁই। তাই হিতেশরঞ্জনের বিচারে, ঘরের কথাই যেন দেশের আত্যন্তিক বৃত্তান্ত, বাকি সব অলংকরণ মাত্র।
যা কালচার, তাই বাঙালি জীবনে নেচার হচ্ছে, সেটাই বাঙালি সংস্কৃতির স্বভাব ও স্বরূপ বলে স্বীকৃতি পাচ্ছে। এই চৈতন্যে দেশজ সংস্কৃতির সহজ মান্যতা ভিন্ন জাতীয় সংস্কৃতির দাবি স্বৈরাচারের নামান্তর মাত্র। দেশজ সংস্কৃতির দরজা আদৌ বন্ধ নয়, অতিথি বা কুটুমরা দেশি অঙ্গনে স্বাগত। সেই অঙ্গনের সাংস্কৃতিক প্রকরণে মার্গ থেকে আসা কুটুম্বিতার স্বাক্ষর পাওয়া যায়, আবার ‘জন’ থেকে আসা কুটুমরাও অঙ্গনটি নিকিয়ে যেতে পারে। এদের সবাইকে নিয়েই তো ‘দেশ’। তবে আঞ্চলিক দেশের পরিধি ও নিজস্ব আত্তীকরণের ক্ষমতার খাপে মার্গ ও জনকে জায়গা করে নিতে হয়— ছাপিয়ে ওঠা বা বাড়তিটুকু বেখাপ্পা ও অনান্দনিক। এই বিচারে জাতীয় সংস্কৃতির পরিমিত নকশায় ‘ভূম’ বা অঞ্চলই হয়ে ওঠে নানা অক্ষবিন্দু। অঞ্চলের প্রাধান্য ও পরিচিতি আদৌ বিচ্ছিন্নতার সূত্র নয়, বরং স্বকীয় উদ্যোগের উৎস। এ হেন পরিমণ্ডলেই কাশীবাসের পরেও দ্রবময়ী তাঁর গাঁয়ে ফিরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন, আর বাইরে যাওয়ার ডাক এলেও বনপলাশীর পদাবলীতেই অট্টামা তৃপ্ত থাকেন। ঈপ্সাটি কূপমণ্ডুকতার জয়গান নয়, বাঙালি থাকা আর মানুষ হওয়ার মধ্যে কোনও স্বতঃবিরোধ এটিতে স্বীকৃত নয়। বরং গোস্পদে আত্মবীক্ষা ও বিশ্ববীক্ষা করার স্বাদপ্রাপ্তিই এ রকম ঈপ্সার মর্ম। গোলকায়নের যুগে সংকলিত প্রবন্ধাবলিতে হিতেশরঞ্জন সান্যালের দেখা ও দেখানো বাংলার মন্দির এই বিশিষ্ট ঈপ্সার দর্শনেই উদ্ভাসিত।


First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.