বঙ্গে বাণিজ্য
তৃষ্ণার শান্তি
ম্যানেজমেন্ট স্কুলের ছকবাঁধা বুকনি নয়। ব্র্যান্ডিং, রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট জাতীয় গ্রাম্ভারি শব্দসম্ভার নয়। বরং পারিবারিকতা, জাতীয়তাবাদ এবং শিক্ষার ঐতিহ্য মিলে কি তৈরি হতে পারে বাঙালির নিজস্ব কোনও ‘বিজনেস মডেল’?
কলেজ স্কোয়্যারে তিন প্রজন্মের ‘প্যারামাউন্ট’ সরবতের দোকানটি বোধ হয় সে দিকেই নির্দেশ করছে। সকাল ১১টা থেকে ছাত্রছাত্রী, শিক্ষকশিক্ষিকা এবং আরও অনেকের ভিড়। ‘‘রোজ গড়পড়তা তিন থেকে সাড়ে তিনশো কাস্টমার আসেন,” বলছিলেন দোকানের মালিক মৃগেন্দ্র মজুমদার।
তবু, দোকানে আজও নেই কোনও ‘ভাড়াটে’ কর্মচারী। মৃগেনবাবুদের একান্নবর্তী পরিবার। তাঁর বোন, ভাইপো, ভাগ্নে, ভাগ্নিরাই যখন সময় পান, পালা করে দোকানে বসেন। সরবত তৈরি, পরিবেশন ইত্যাদি নানা কাজ করেন। পরে রোজের আয় ভাগাভাগি করে নেন। দোকানের মাসিক আয় গড়ে ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা। “পারিবারিক সরবতের দোকান, ফলে গুণমান ঠিকঠাক রাখতে হয়। ভাড়াটে কর্মচারী দিয়ে সেটি বজায় রাখা দুষ্কর,” বলছিলেন মৃগেনবাবুর ভাগ্নে সোমেন কর। পারিবারিক আওতার বাইরে নামটি যেতে দিতে চান না বলে, ৯৪ বছরের এই দোকান আজও ‘ফ্র্যাঞ্চাইজি’ দেয়নি। এই বছর থেকে অবশ্য একটি জিনিস চালু করেছেন ওঁরা। কেউ চাইলে, বোতলে সরবত বাড়িতে নিয়ে যেতে পারেন।
বরিশালের কাঁচাবালিয়া গ্রাম থেকে আসা নীহাররঞ্জন মজুমদার ১৯১৮ সালে এই দোকানটি তৈরি করেছিলেন। জাতীয়তাবাদের সঙ্গে দোকানের অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক। নীহারবাবু বরিশাল অনুশীলন সমিতির সদস্য ছিলেন, প্রেসিডেন্সি কলেজের মাঠে হামিদা পালোয়ানের কাছে কুস্তি লড়া শিখতেন। মহাবোধি সোসাইটি হলের পাশে, আজও প্যারামাউন্ট সরবতের দোকান যে ঘরে, সেটিই ছিল সমিতির গোপন কেন্দ্র। প্রথমে দোকানের নাম ছিল ‘প্যারাডাইস’। সরবতই একমাত্র পণ্য ছিল না, বরিশালের ছুরি, কাঁচি, বঁটি ইত্যাদি বিক্রি করতেন নীহারবাবু। কলেজ স্ট্রিট, সূর্য সেন স্ট্রিটের তখনকার পাইস হোটেল, মেসবাড়িতে ওই সব বঁটি-কড়াই-হাতা-খুন্তির ভাল বাজার ছিল।
বাজারে তখন সরবত একটাই। সাহেবি ‘ভিমটো’ সংস্থার। অন্য দিকে ছিল খগেন্দ্রনাথ মিত্রের ‘প্যারাগন’ সরবতের দোকান। প্যারাগন উঠে গিয়েছে, কিন্তু প্যারামাউন্টে আজও ঢুকলে দেখতে পারেন লম্বা এক সেলেব্রিটি-তালিকা। জগদীশচন্দ্র বসু, মেঘনাদ সাহা, সুভাষচন্দ্র বসু, মানবেন্দ্রনাথ রায়, কাজী নজরুল থেকে ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, সত্যজিৎ রায় হয়ে হাল আমলের বুলা চৌধুরী, সূর্যশেখর গঙ্গোপাধ্যায় কে না সরবত খেতে এসেছেন এখানে? এখানকার ৩০ টাকা দামের ‘ডাবের সরবতের’ রেসিপিটি স্বয়ং প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের অবদান। নীহাররঞ্জনবাবুকে আচার্য বলেছিলেন, “ডাবের সরবত তৈরি করিস। বেশি নয়, হাল্কা শাঁস রয়েছে, এমন ডাব। বসিরহাটের ডাব এই ব্যাপারে ভাল। ছেলেরা জলটা খাওয়ার পরে শাঁসে ফুড ভ্যালু আছে, ওটিও খেয়ে নেবে।” আজও ডাবের সরবতের জন্য এখানে বসিরহাট থেকেই ডাব আসে। “কত দিন চালাতে পারব, জানি না। এখন মোবাইল টাওয়ারের দাপটে বসিরহাটের ডাবও বৈশিষ্ট্য হারিয়েছে,” দুঃখ করছিলেন নীহারবাবুর পুত্র মৃগেনবাবু।
স্বদেশি, জাতীয়তাবাদী ঐতিহ্য, প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী...সব মিলিয়েই এ দোকানের ‘ব্র্যান্ড ইকুইটি’। আজও এসি নেই, মাথার ওপরে লম্বা রডের ইলেকট্রিক ফ্যান। গদি-আঁটা চেয়ার নয়, বেঞ্চ ও টেবিল। “টেবিল টপগুলি ইতালিয়ান মার্বেলের। বাবা ৮ টাকা দরে কিনেছিলেন,” জানাচ্ছেন মৃগেনবাবু। বিখ্যাত সরবতখোরদের এক-এক জনের এক-একটি টেবিল পছন্দ ছিল। “ফৈয়াজ খান সাহেব এলে এই টেবিলে বসতেন, সত্যজিৎ ওইটায়, নবনীতাদি (দেবসেন) ওখানটায়,” দেখাচ্ছিলেন মৃগেনবাবু। মুখেমুখে ছড়ানো এই ইতিহাসই ওঁদের অন্যতম অবলম্বন, “আমরা কোথাও বিজ্ঞাপন দিই না, দরকারও হয় না,” বলছিলেন কর্ণধারেরা।
ঐতিহ্য কোনও ব্যবসার ‘ব্র্যান্ড ইকুইটি’ হতে পারে, কিন্তু ব্যবসায়িক নীতি নয়। ব্যবসায়িক নীতি হচ্ছে, ঐতিহ্য মেনে পণ্যসম্ভারের উৎকর্ষসাধন ও রূপান্তর। ভারতে এখন ‘প্যাশন ফ্রুট’ উৎপন্ন হয়, তার এসেন্সও কিনতে পাওয়া যায়। মৃগেনবাবু প্রায় এক বছর লেগে থেকে রাবড়ি দিয়ে কাজু, পেস্তা মিশিয়ে প্যাশন ফ্রুটের সরবত তৈরি করেছেন। ওটিই দোকানের সবচেয়ে দামি সরবত, দাম ১০০ টাকা। রোজ ২৫ থেকে ৩০ গ্লাস বিক্রি হয়। সবচেয়ে বেশি বিক্রি অবশ্য নতুন জলজিরা দিয়ে তেঁতুলের সরবত। “গরমে সবাই ওটা খেতে চেয়েছে,” জানালেন মৃগেনবাবু। নতুন প্রজন্মের চাহিদায় পণ্যতালিকায় জ্বলজ্বল করছে কোল্ড কফিও। “আমরা কিন্তু মেশিনে কোল্ড কফি তৈরি করি না। ঠান্ডা দুধে মালাই দিয়ে, কফিটা হাতে তৈরি করি,” বললেন ওঁরা।
হাতে তৈরি সরবত এ দোকানের বৈশিষ্ট্য। দোকানের পিছনেই রান্নাঘরে ড্রাম, জেরিকেন, জাগ, কাঠের কাঁটা ইত্যাদি রয়েছে। রান্নাঘরটি পরিচ্ছন্ন, কিন্তু হালের ‘কোয়ালিটি কন্ট্রোল’ অনুযায়ী টেস্ট টিউব, বিকার, গ্লাভ্স ইত্যাদির বালাই নেই। “ওগুলি এক ধরনের দেখানেপনা। আসলে কোয়ালিটি কন্ট্রোল আমাদের মাথায় থাকে। সরবত খেয়ে এক জনও অসুস্থ হলে সে দিনই আমাদের ৯৩ বছরের সুনাম ধূলিসাৎ হয়ে যাবে,” বলছিলেন মৃগেনবাবু।
এই সুনামে সাপ্লায়ারদের অবদানও যথেষ্ট। নীহারবাবুর আমলের সরবরাহকারীরা, আজও! বসিরহাটের ডাবের পাশাপাশি এসেন্স আসে ‘ড্রুক ফার্মাসি’ থেকে। আজও বরফ আসে ‘হিন্দুস্থান আইস’ থেকে। “এঁদের সঙ্গে প্রায় পারিবারিক সম্পর্ক। আমাদের চাহিদা ওঁরা জানেন,” বলছিলেন মৃগেনবাবু।
ভাল সরবতের অনেক তরিবতি। কাঁচা আমের সরবতে জল না টক দই? দইটা ফ্রিজ থেকে কতক্ষণ পরে বের করতে হবে? কোকো মালাই দুধে ভাল যাবে, না অন্য কিছুতে? এক-একটা সরবত তৈরির পিছনে পরীক্ষা-নিরীক্ষাতেই প্রায় চার-পাঁচ মাস লাগে। জেনে রাখুন, সরবত তৈরির জন্য রোজ ১০ হাঁড়ি দই প্যারামাউন্টের রান্নাঘরে লাগবেই। এই যে তেঁতুল, লিচুর নতুন সরবত, সেখানেও ‘বটমলাইন’ কিন্তু আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের সেই নির্দেশ। “সরবত বানালেই তো হল না। আমরা চাই এমন সরবত, যার ফুড ভ্যালু আছে,” বললেন মৃগেনবাবু।
প্যারামাউন্ট অবশ্য উৎসব-অনুষ্ঠানেও আজকাল পরিবেশন করে। “বেশি অর্ডার নিই না, বড়জোর একটা। আমি নিজে সরবত তৈরি করে সেট করে দিয়ে আসি। তার বেশি হলে সামলানো সম্ভব নয়,” বলছিলেন মৃগেনবাবু। আউটডোরে সরবত পরিবেশনেও ইতিহাস আছে। সুভাষচন্দ্র বসুর আমলে শ্রদ্ধানন্দ পার্কের জনসভায় সরবত যায় প্যারামাউন্ট থেকে।
সরবত, ইতিহাস সব মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়াকেই বোধ হয় এই শহরে ‘প্যারামাউন্ট’ বলে।

ছবি: সুদীপ আচার্য




অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.