অভাব পরিকাঠামোর
অস্বাস্থ্য কেন্দ্র
কোথাও ছাদ থেকে চাঙড় খসে পড়েছে। কোথাও জানলা-দরজা ভাঙা। কোথাও চারপাশে জঙ্গল। বৃষ্টি হলে জল জমে যায়। অন্তর্বিভাগ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। দীর্ঘ দিনের অবহেলায় হাওড়ার বেলগাছিয়া, বালিটিকুরি এবং জগাছা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের এখন এই অবস্থা।
এই তিনটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কোনওক্রমে শুধু প্রাথমিক চিকিৎসাটুকু হয়। রবিবার ও অন্যান্য ছুটির দিন স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ থাকে। জ্বর, সর্দিকাশি, পেটের অসুখ ছাড়া অন্য রোগীদের হাওড়া জেলা হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আগে অন্তর্বিভাগে ভাল চিকিৎসা হত। ছিল চিকিৎসক, নার্স ও অন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য কোয়ার্টার্সও। কিন্তু, এখন অধিকাংশ কোয়ার্টার্সই পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
হাওড়া-আমতা রোডের বালিটিকুরি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এখন কোনও চিকিৎসক নেই। ১৯৭৫-এ তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী অজিত পাঁজা এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের উদ্বোধন করেছিলেন। বাইরে রঙের প্রলেপ পড়লেও ভিতরের অবস্থা জরাজীর্ণ। জানলা ভাঙা। খসে পড়েছে পলেস্তরা। অবহেলায় পড়ে আছে ছ’টি শয্যা। বৃষ্টির সময়ে চেয়ার, টেবিল সরিয়ে কাজ করতে হয়। ছাদ থেকে জল পড়ে নষ্ট হচ্ছে ওষুধও। মাঝেমধ্যেই চাঙড় ভেঙে পড়ে। স্বাস্থ্যকর্মীদের কোয়ার্টার্সেরও জীর্ণ দশা।এখন এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এক জন ফার্মাসিস্ট এবং দু’জন নার্স আছেন। ২০০২-এর পরে কোনও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ নেই। ২০০৮-এ মেডিক্যাল অফিসার অবসর নেওয়ার পরে ওই পদে কেউ নিযুক্ত হননি। অন্তর্বিভাগ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, আগে প্রসূতি ও রোগীরা ভর্তি থাকতেন। দুর্ঘটনায় আহতদেরও নিয়ে আসা হত। এখন সব বন্ধ হয়ে গিয়েছে। রোগী এলে বেশির ভাগ সময়ে কোনা অথবা হাওড়া জেলা হাসপাতালে রেফার করে দেওয়া হয়।” ফার্মাসিস্ট সোনা সরেন জানালেন, এখন শুধু জ্বর, সর্দিকাশির মতো অসুখের চিকিৎসা হয়। বার বার জানানো সত্ত্বেও মেডিক্যাল অফিসার পাওয়া যায়নি।
বেলগাছিয়ার কিসমত প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিরও এখন ভগ্নপ্রায় অবস্থা। চারপাশ আগাছায় ভরা। বর্ষায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সামনে হাঁটু-জল জমে যায়। রয়েছে সাপের উপদ্রবও। ছাদ থেকে বৃষ্টির জল পড়ে। দরজা-জানলা ভাঙা। পানীয় জলের অভাব রয়েছে। রান্নাঘর ও কোয়ার্টার্সের অবস্থা কার্যত ভুতুড়ে বাড়ির মতো। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চত্বরে গরু ও শুয়োর চরে বেড়ায়। যদিও এখানে এক জন চিকিৎসক, এক জন ফার্মাসিস্ট ও দু’জন নার্স আছেন। এক স্বাস্থ্যকর্মী জানান, এখনও দৈনিক গড়ে একশো জন রোগী আসেন।
জগাছা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির নতুন ভবন থাকলেও জ্বর, সর্দি ও যক্ষ্মা ছাড়া অন্য কিছুর চিকিৎসা হয় না। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কোয়ার্টার্স ফাঁকা পড়ে আছে। আগে ছ’টি শয্যা ছিল। জগাছা, ধাড়সা, নয়াবাজ, সাঁতরাগাছি কলোনি অঞ্চলের বাসিন্দারা এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের উপরে নির্ভরশীল। এখন এক জন চিকিৎসক আসেন। আছেন দু’জন নার্স ও এক জন ফার্মাসিস্ট। স্থানীয় বাসিন্দা সোনালি দেবের কথায়: “এখন ঠিকমতো চিকিৎসা হয় না। স্যালাইন দেওয়া হয় না। ইঞ্জেকশন বাইরে থেকে কিনে দিতে হয়। ডাক্তার তাড়াতাড়ি চলে যান। বর্ষায় হাঁটুসমান জল দাঁড়িয়ে যায়। কয়েক দিন জল দাঁড়িয়ে থাকে। তখন কষ্ট করে আসতে হয়।”
স্থানীয় বিধায়ক জটু লাহিড়ির কথায়: “আগের সরকার এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলির দিকে নজর দেয়নি। আগে অন্তর্বিভাগে রোগী ও প্রসূতি ভর্তি থাকত। গরিব মানুষ চিকিৎসা পেত। এখন খুবই খারাপ অবস্থা। শুধু বহির্বিভাগে চিকিৎসা হয়। উন্নতির জন্য চেষ্টা করব। তবে সময় লাগবে।”
ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলির বেহাল দশা এবং পরিকাঠামোর অভাবের কথা স্বীকার করে হাওড়ার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক স্বাতী দত্ত বলেন, “আমাদের ডাক্তার, নার্স এবং অন্যান্য কর্মীর অভাব আছে। বাধ্য হয়ে অন্তর্বিভাগ বন্ধ করে দিতে হয়েছে। বাড়িগুলির অবস্থাও ভাল নয়। ফলে হাওড়া হাসপাতালের উপর চাপ বাড়ছে। ডাক্তার ও নার্সের জন্য আবেদন করা হয়েছে।”
ছবি: রণজিৎ নন্দী




অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.