|
|
|
|
শালবনিতে গ্রামবাসীর ভরসা এখন জিন্দলদের স্বাস্থ্য শিবির |
গার্গী গুহঠাকুরতা • কলকাতা |
কাঁচা হাতে আঙুল দিয়ে ইটের গুঁড়োয় মেটে রঙের দেওয়াল লিখন। ‘জিন্দল’। তার পরের লাইনে ‘ডাক্তার’।
এটাই আশনাসুলি গ্রামের সাপ্তাহিক স্বাস্থ্য শিবিরের পাকা সাইনবোর্ড।
শুধু আশনাসুলি নয়। সীতারামপুর, বাসকোবনা-সহ শালবনির ২৫টি গ্রামে ছড়িয়ে রয়েছে এমন স্বাস্থ্য শিবির। পশ্চিম মেদিনীপুরে জিন্দলদের ইস্পাত প্রকল্পের ৪৫ কিলোমিটার পাঁচিলের ধার ঘেঁষা এই এলাকায় রয়েছেন আদিবাসী-সহ ৩০ হাজার মানুষ। যাঁদের সঙ্গে স্বাস্থ্য পরিষেবার পরিচিতি প্রায় ছিল না বললেই চলে। গত
চার বছর ধরে একটু একটু করে পরিস্থিতি বদলেছে।
বদলের ছবিটা দেখা গেল চন্দনকাঠ গ্রামের স্বাস্থ্য শিবিরে। গ্রামের একমাত্র পাকা বাড়ির এক চিলতে ঘর। দুপুর একটায় উপচে পড়া ভিড়ে নিজের ছোট মাথাটা গলিয়ে দিল বছর চারেকের অরূপ। সঙ্গে বাড়ির বড় কেউ নেই। সবাই চাষের কাজে ব্যস্ত মাঠে। একরত্তি ছেলে ঠিক করে বুঝিয়ে বলতেও পারছে না নিজের সমস্যার কথা। শুধু ঢলঢলে হাফ-প্যান্টটা তুলে দেখাল ডান পায়ের বিশাল ফোড়া। হাত বাড়িয়ে দিল ওষুধের জন্য। ওই ভিড়ের মধ্যেই ছ’মাসের মেয়েকে কোলে নিয়ে দাঁড়ানো রানি মাহাতো জানালেন, গত চার বছর ধরে জ্বর, রক্ত-আমাশা, পেটের অসুখ বা ছোটখাটো চর্মরোগের জন্য আর সদর হাসপাতালে দৌড়তে হয় না। “নিয়মিত ডাক্তার দেখাতে পারছি। ওষুধও পাচ্ছি। এ সব পেতে দৌড়ঝাঁপ করতেও হচ্ছে না।”
|
|
স্বাস্থ্য শিবিরের সেই ‘সাইনবোর্ড’। —নিজস্ব চিত্র |
শালবনি ইস্পাত প্রকল্প ঘোষণার সময়েই গ্রামীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মডেল গড়ার পরিকল্পনা জানিয়েছিলেন জিন্দলরা। কী রকম? তিনটি ধাপে গড়ে উঠবে স্বাস্থ্য পরিষেবার পরিকাঠামো। প্রকল্পের মধ্যে আপাতত দু’টি ক্লিনিক চলছে। প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্রের মতো কাজ করছে তারা। এক্স-রে বা অন্যান্য পরীক্ষার জন্য মেদিনীপুর সদর হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে অ্যাম্বুল্যান্সে। এর পরের ধাপে সপ্তাহের একটি নির্দিষ্ট দিনে গ্রাম পঞ্চায়েতের দেওয়া জায়গায় প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্র করা হবে। এবং চূড়ান্ত ধাপে থাকবে ৫০ শয্যার একটি হাসপাতাল। এ সব খুঁটিনাটি নিয়ে অবশ্য মাথাব্যথা নেই ষাটোধ্বর্র্ সরলা মাহাতোর। তাঁর কথায়, “কয়েক কিলোমিটার হেঁটে প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্রে আর যেতে হয় না। বাড়ির কাছেই ডাক্তার-ওষুধ পাচ্ছি। এটুকু টিঁকে থাকলেই আমরা খুশি।”
প্রথমে ছিল গ্রামবাসীদের মনে ভরসা তৈরি হওয়ার পর্ব। এখন সেই ভরসার জায়গা থেকেই বাড়ছে প্রত্যাশা। স্থানীয় মানুষের এই প্রত্যাশার কথা জানে জেএসভি ইনোভেশনস। শালবনিতে জিন্দলদের হয়ে স্বাস্থ্য পরিষেবা দিচ্ছে চিকিৎসকদের এই সংস্থা। সংস্থার অন্যতম কর্তা শতদল সাহা বলেন, “স্থায়ী ক্লিনিক ও শিবির মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২৫০ মানুষের চিকিৎসা হয়। সেই পরিষেবা আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে আরও এক ধাপ এগোতে চান জিন্দলরা। সেই ভাবনার সূত্র ধরেই ৫০ শয্যার হাসপাতাল তৈরির কাজ শুরু
হবে।” প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এই হাসপাতাল স্থানীয়দের জন্য তৈরি হবে বলে তাঁর দাবি। কারখানা চালু হওয়ার পরে সংস্থার কর্মীদের জন্য থাকবে বাড়তি শয্যা। সব
মিলিয়ে তখন ১৫০ শয্যার হাসপাতাল পাবে শালবনি।
গ্রামীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সুযোগ ছড়িয়ে দিতে তথ্যপ্রযুক্তিরও হাত ধরছে শতদলবাবুর সংস্থা। তৈরি করা হবে ‘কিয়স্ক’। এই কিয়স্ক যিনি চালাবেন, তিনি রক্তচাপ মাপা, ব্লাড সুগার পরীক্ষা, জ্বর মাপার কাজে প্রশিক্ষণ পাবেন। প্রয়োজনে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্যও কিয়স্ক থেকে পাবেন সাধারণ মানুষ। এ ছাড়াও মোবাইল ফোনভিত্তিক একটি সফটওয়্যারে এসএমএস-এর মাধ্যমে রোগী ও চিকিৎসকের মধ্যে যোগসূত্র তৈরি হবে।
শালবনি সত্যিই বদলাতে চলেছে! |
|
|
|
|
|