প্রবন্ধ ২...
আপনার সন্তান যদি ‘গে’ হয়?
য়েক দিন আগেই কথা হচ্ছিল এক উচ্চশিক্ষিত অধ্যাপিকার সঙ্গে। তাঁর সন্তান কেমন ‘মানুষ’ হচ্ছে, কিংবা আদৌ হচ্ছে কি না, এই সব আলোচনা হচ্ছিল। কথাপ্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করেছিলাম: ‘আচ্ছা ধরা যাক তোমার সন্তান এক জন সমকামী...’। মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে তিনি বললেন, ‘এ রকম বোলো না, খুব দুঃখ পাব তা হলে।’ এখানে কোনও ঠিক-ভুলের প্রশ্ন নেই, ভাল-মন্দেরও না। বাস্তব এই যে, মঙ্গলপ্রার্থী মা তাঁর সন্তানের মধ্যে এই ‘বিকার’ দেখলে আহত হবেন। আইন কী বলল, স্বীকৃতি দিল কি দিল না, সে সব অনেক পরের প্রশ্ন। সামাজিক ভাবেই আমরা এখনও সমলিঙ্গ যৌনতাকে স্বীকার করতে পারিনি। এক ধাপ এগিয়ে লিখি: ব্যক্তিগত ভাবেই আমরা এখনও সমকামীদের স্বীকৃতি দিতে পারিনি।
সমলিঙ্গচারীরা আমাদের সমাজে এখনও প্রান্তিক। ৩৭৭ ধারা থেকে প্রক্ষিপ্ত সমস্যা তাই এখনও ‘ওঁদের’ সমস্যা। আমরা মিছিলে হাঁটতে পারি, সোশ্যাল মিডিয়াতে আন্দোলন সংগঠিত করতে পারি, খবরের কাগজের পাতায় প্রবন্ধ লিখতে পারি। এ-সবের দরকারও আছে। কিন্তু ফারাকটা তবু থেকেই যাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় বন্ধুদের লিখতে দেখছি, ‘আই অ্যাম নট গে, বাট আই সাপোর্ট গে রাইটস।’ অর্থাৎ, আমি কিন্তু আমিতেই রয়েছি, তোমার আন্দোলনে সাবধানে, গা বাঁচিয়ে পাশে দাঁড়ালাম।
আসলে যেমন প্রাক্-বিবাহ যৌনতা, অন্য ধর্মে বিবাহ, মায় একক মাতৃত্বের সমস্যাগুলো ‘আমাদের’ মূলস্রোতের সমস্যা, যা নিয়ে চায়ের দোকানে বা পুজোর প্যান্ডেলে, বা অনুষ্ঠান-বাড়িতে আলোচনা চলে, সমকামীদের সমস্যা এখনও সে ভাবে আমাদের সমাজে সকলের সমস্যা হয়ে উঠতে পারেনি। বিজ্ঞাপনে, টেলি-সিরিয়ালে, সামাজিক অনুষ্ঠানে ‘ওঁদের’ কোনও উপস্থিতি টের পাওয়া যায় না। অথচ মজার কথা এই যে, বিকল্প যৌনতার মানুষজন ছড়িয়ে রয়েছেন আমাদের সামাজিক পরিসরে, আমাদের মামা, কাকা, ভাই, বোন, ছোটপিসি। সামাজিক প্রেক্ষিতে এদের নিয়ে অতলান্ত কৌতূহল রয়েছে, কিন্তু সঙ্গে মিশে রয়েছে একটা লজ্জাবোধ, এক রকম সামাজিক বাধা।
হালে এই আলোচনাকে অ্যাকাডেমিক ডিসকোর্সের বাইরে বের করে আনা যাচ্ছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, সমকামীদের জোটবদ্ধ আন্দোলন, শহরে-শহরে (এখনও ‘গ্রামে-গ্রামে’ লিখবার সময় আসেনি) রামধনু-মিছিল বৃহত্তর সমাজকে সচেতন করেছে। যদিও সমস্যা হল, পপুলার কালচারের প্রতর্কে এই সমস্যার উপস্থিতি অনেকটাই প্যারডি পর্যায়ের। সর্বগ্রাসী বলিউড-এর কথা ভাবলেই মনে আসে ‘কল হো না হো’ ছবিতে ‘কান্তাবেন’-এর সঙ্গে শাহরুখ-সাইফের ‘হাস্যরস’ উদ্রেককারী সেই সব দৃশ্য, আর সেই কদর্যতা দেখে হলভর্তি দর্শকের হাসির ছর্রা। মনে আছে, ‘দোস্তানা’ ছবিটা দেখেছিলাম ইউরোপ-এ একটা ছোট্ট প্রেক্ষাগৃহে, কিছু অধ্যাপক বন্ধুর সঙ্গে। ছবির শেষে তাঁদের এক জন বলেছিলেন, ‘ভারতে কি সমকামীদের এ ভাবেই দেখা হয়?’ লজ্জা পেয়েছিলাম। পরে ভেবেছি, ‘মাই ব্রাদার নিখিল’ ছবিটার কথা কি আমি ওঁকে বলতে পারতাম! মনে হয় না। সে-ও তো অপরায়নের আর একটা প্রেক্ষিত মাত্র, ‘‘আহা, ‘গে’ বলে কি মানুষ নয়!’’
একটা ছবির কথা বলি। টম ফর্ড-এর ‘আ সিঙ্গল ম্যান’। সমকামী অধ্যাপক জর্জ ফকনার-এর একাকিত্বের গল্প। ষোলো বছরের সঙ্গী জিমের মৃত্যুর পর তাঁর আগ্রাসী অবসাদের গল্প। গল্পে জর্জ-এর কিন্তু কোনও অপরায়ন নেই। মূলস্রোতের এক নিঃসঙ্গ, বিষণ্ণ মানুষ, বাকিদের সঙ্গে তফাত নেই, তাঁর যৌন-প্রবৃত্তি তাঁকে অন্যদের থেকে ভিন্ন করে চিনিয়ে দেয়নি। তাঁর একাকিত্ব এই ছবির উপজীব্য, যৌনতা নয়। আমাদের সমাজ কিন্তু সমকামকে এই মূলস্রোতে স্বীকৃতি দেওয়ার থেকে বহু দূরে। ৩৭৭ বাতিল করার প্রয়োজন আছে, তবে সঙ্গে সঙ্গে সমাজটাকেও একটু পাল্টে নেওয়া দরকার।

প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজির শিক্ষক


First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.