নৈরাজ্যের প্রহর
পাশের দাবিতে শিক্ষিকাদের রাতভর ঘেরাও,
সংসদের ইনাম ফের পরীক্ষা
টেস্ট-এ ফেল করা সত্ত্বেও পাশ করিয়ে দেওয়ার দাবিতে টানা ২২ ঘণ্টা শিক্ষিকাদের ঘেরাও করে রাখল দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রীরা। আর সেই দাবির কাছে কার্যত মাথা ঝুঁকিয়ে মঙ্গলবার উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের পক্ষ থেকে ফেল করা এবং গ্রেস নম্বর পেয়ে পাশ করা ছাত্রীদের নতুন করে পরীক্ষা নেওয়ার ফরমান দেওয়া হল। যে ফরমান শিক্ষা জগতে ইদানীং বেড়ে চলা নৈরাজ্যে নতুন মাত্রা জুড়ল বলেই সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত।
কারণ, সন্তোষপুরের ঋষি অরবিন্দ বালিকা বিদ্যাপীঠের ছাত্রীদের দেখানো পথেই টেস্টে পাশ করিয়ে দেওয়ার দাবিতে আরও বেশ কয়েকটি স্কুলে বিক্ষোভ দেখিয়েছে পড়ুয়ারা। সন্তোষপুরের স্কুলের ঘটনার পিছনে শাসক দলের নেতাদের ইন্ধন রয়েছে বলেই বিরোধীদের অভিযোগ। তার পরেও সংসদের এই সিদ্ধান্ত যা খুশি করে পার পেয়ে যাওয়ার শিক্ষাটাই পড়ুয়াদের দিয়ে দিল বলে শিক্ষাবিদদের একটা বড় অংশের মত।
সন্তোষপুরের ওই স্কুলে উচ্চ মাধ্যমিক টেস্টের ফল প্রকাশ হয় গত শনিবার। ১০৫ জন ছাত্রীর মধ্যে ২৯ জন পাশ করতে পারেনি। সোমবার দাবি ওঠে, ফেল করা পরীক্ষার্থীদের খাতা দেখাতে হবে। চাপের মুখে স্কুল কর্তৃপক্ষ সে দাবি মেনেও নেন। অভিযোগ, তখন ছাত্রী বা অভিভাবকেরা খাতা দেখানোর দাবি থেকে সরে এসে পাশ করিয়ে দেওয়ার দাবি জানাতে থাকেন। তাতে রাজি না হওয়ায় শিক্ষিকাদের ঘেরাও করা হয়। ঘেরাওকারী ছাত্রীদের অভিযোগ, পরীক্ষায় নকল করতে গিয়ে ধরা পড়া ছাত্রীকেও পাশ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। তা হলে বাকিরা কী অপরাধ করল? ছাত্রীদের দাবি, তাদের পাশ না করালে ওই স্কুল থেকে কাউকেই উচ্চ মাধ্যমিকে বসতে দেবে না তারা।
ঘেরাওয়ে বন্দি শিক্ষিকারা। ঋষি অরবিন্দ বালিকা বিদ্যাপীঠে। —নিজস্ব চিত্র
সোমবার বিকেল থেকে টানা ২২ ঘণ্টা আটক থাকার পরে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের সচিব অচিন্ত্যকুমার পাল এবং উপসচিব (পরীক্ষা) মলয় রায়ের হস্তক্ষেপে ঘেরাও-মুক্ত হন স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা এবং সহকারী শিক্ষিকারা। সংসদের প্রতিনিধিরা সব ছাত্রীর খাতা সিল করে রাখতে বলে ট্যাবুলেশনের কাগজপত্র নিয়ে গিয়েছেন। পরে সংসদ কর্তৃপক্ষ জানান, অকৃতকার্য ছাত্রীদের ফের পরীক্ষা নিতে বলা হবে। যাদের বাড়তি নম্বর (গ্রেস) দিয়ে পাশ করানো হয়েছে, পরীক্ষায় বসতে হবে তাদেরও। প্রশ্ন উঠেছে, স্কুলের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার ক্ষেত্রে সংসদ এ ভাবে ফরমান দিতে পারে কি না। তা ছাড়া, পড়ুয়াদের বিক্ষোভের কাছে মাথা নুইয়ে নতুন করে পরীক্ষায় বসার সুযোগ করে দিয়ে কী বার্তা দেওয়া হল, তা নিয়েও শুরু হয়েছে বিতর্ক।
সংসদ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, স্কুল কর্তৃপক্ষের অনুরোধেই তাঁরা স্কুলে গিয়েছিলেন এবং সমস্যা মেটাতে হস্তক্ষেপ করেছেন। প্রথমে ভাবা হয়েছিল, খাতাগুলির পুনর্মূল্যায়ন করানো হবে। তার পর ট্যাবুলেশনের কাগজপত্রে বেশ কিছু অসঙ্গতি ধরা পড়ে। দেখা যায়, ১ নম্বর পেয়েও কোনও ছাত্রী পাশ করেছে, আবার কিছু বেশি নম্বর পেয়েও কেউ ফেল করেছে। সংসদের বক্তব্য, স্কুল কর্তৃপক্ষ এগুলি তাঁদেরই ভুল বলে স্বীকারও করেছেন। সেই কারণেই ওই স্কুলকে আর এক বার পরীক্ষা নিতে বলা হচ্ছে। সংসদের উপসচিব (পরীক্ষা) মলয় রায় দাবি করেন, সংসদের এই নির্দেশ মানতে স্কুল বাধ্য। কারা দেবে ফের পরীক্ষা? সংসদ সভাপতি মুক্তিনাথ চট্টোপাধ্যায় বলেন, “যারা অকৃতকার্য তারা তো দেবেই। পাশাপাশি যাদের বাড়তি নম্বর দিয়ে (গ্রেস) দিয়ে পাশ করানো হয়েছে, তারাও পরীক্ষা দেবে।”
সংসদের এই ফরমানে আদৌ খুশি নন স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা শ্রীমতি ঘোষ এবং অন্য শিক্ষিকারা। তাঁদের আশঙ্কা, এর ফলে মূল্যায়ন-ব্যবস্থার উপরে ছাত্রছাত্রীদের আস্থা থাকবে না। স্কুল চালানো কঠিন হয়ে পড়বে। খোদ শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুও সংসদের ফরমান নিয়ে দ্বিমত পোষণ করছেন। তাঁর কথায়, “এই ব্যাপারে স্কুলের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। সংসদ কেবল অনুরোধ করতে পারে, নির্দেশ দিতে পারে না।” বুধবার তিনি এ বিষয়ে সংসদ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলবেন বলে জানিয়েছেন।
ঋষি অরবিন্দ বালিকা বিদ্যাপীঠ স্কুলের পরিচালন সমিতির সভাপতি তথা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অটল চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, “সংসদের কাছ থেকে লিখিত ভাবে কিছু পাইনি। তাই এখনই কিছু বলতে পারব না।” ট্যাবুলেশনে অসঙ্গতি বিষয়ে তাঁদের ব্যাখ্যা যারা বেশ কয়েকটি বিষয়ে ভাল করে একটি বিষয়ে খারাপ করেছে, তাদের গ্রেস নম্বর দেওয়া হয়েছে। যারা কোনও বিষয়েই ভাল করেনি, তাদের গ্রেস নম্বর দেওয়া হয়নি। নকল করতে গিয়ে ধরা পড়া ছাত্রীকে পাশ করানো বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কোনও মন্তব্য করেননি। প্রধান শিক্ষিকা বলেন, “এ বার তো মাধ্যমিকের ছাত্রীরাও পাশ করতে না পেরে বোর্ডকে ডাকবে।” তাঁর আশঙ্কা সত্যি প্রমাণ করে ওই স্কুলে মাধ্যমিকের টেস্টে ফেল করা ছাত্রীদের একাংশও পাশ করিয়ে দেওয়ার দাবিতে দিদিদের সঙ্গে গলা মিলিয়েছে।
শহরের অন্য স্কুলেও অকৃতকার্য পড়ুয়ারা একই দাবি তুলতে শুরু করেছে। বেহালার জগৎপুর রুক্মিণী বিদ্যামন্দির ফর বয়েজ-এ মঙ্গলবার উচ্চ মাধ্যমিকের টেস্টে ফেল করা এক দল ছাত্র পাশ করানোর দাবিতে বিক্ষোভ দেখায়। অভিভাবকদের একাংশ তাদের সঙ্গে যোগ দেন। এমনকী শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সঙ্গে অভিভাবকদের কেউ কেউ হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন বলেও অভিযোগ।
পুলিশ এসে পরিস্থিতি সামাল দেয়। উত্তর চব্বিশ পরগনার শ্যামনগরে ঋষি অরবিন্দ বিদ্যানিকেতনে একই দাবিতে এক দল ছাত্র স্কুলে ঢুকে চেয়ার-টেবিল উল্টে বিক্ষোভ দেখিয়েছে বলে অভিযোগ।
• সোমবার বেলা তিনটে থেকে ঘেরাও শুরু।
• এক ঘণ্টা বাদে পুলিশ ডাকা হয়।
• রাতভর ঘেরাও শিক্ষিকারা।
• মঙ্গলবার সকাল থেকে উত্তেজনা।
• স্কুলে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের সচিব এবং উপ সচিব।
• পড়ুয়া, কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা।
• ট্যাবুলেশন শিট নিয়ে গেলেন সংসদ কর্তারা।
• জানান, খাতার পুনর্মূল্যায়ন হবে।
• সন্ধ্যায় সিদ্ধান্ত বদল।
• ফেল করাদের পরীক্ষা।
• গ্রেস নম্বরে পাশ হলেও পরীক্ষা।
• শিক্ষামন্ত্রী বললেন, স্কুলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
প্রবীণ শিক্ষকদের অনেকেই তাই সংসদের ভূমিকায় সিঁদুরে মেঘ দেখছেন। অধ্যাপক পবিত্র সরকার মনে করেন, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রতি অবিশ্বাসের বীজ ঢুকিয়ে দিল। তিনি বলেন, “শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অপমান তো করা হলই, সংসদের সিদ্ধান্ত সাপের ঝাঁপি খুলে দিল।” বিরোধী দলনেতা সূর্যকান্ত মিশ্র বলেন, “এর পরে তো স্কুল বলবে, আর কোনও টেস্ট নেওয়ারই দরকার নেই।” প্রবীণ শিক্ষক সুনন্দ সান্যালের আশঙ্কা, “সংসদ যদি সব ক্ষেত্রেই এমন ব্যবস্থা নিতে না পারে, তবে পরিণতি মারাত্মক হবে।” অধ্যাপক সুকান্ত চৌধুরী অবশ্য মনে করেন, “সংসদ নিশ্চয়ই বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।” আর, রাজ্যের স্কুলগুলির উদ্দেশে শিক্ষামন্ত্রীর বার্তা, সংবাদমাধ্যমে যাওয়ার আগে প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে সমস্যা মিটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করুন।
অরবিন্দ বিদ্যাপীঠে সমস্যা মেটানোর জন্য কী পদক্ষেপ করা হয়েছিল? স্কুল কর্তৃপক্ষের দাবি, তাঁরা প্রথমে ছাত্রী এবং অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু বাইরের লোক জড়ো হওয়ায় তাঁরা সার্ভে পার্ক থানায় ফোন করেন। পুলিশ আসে। তবে পুলিশি হস্তক্ষেপে ঘেরাও-মুক্ত হতে চাননি শিক্ষিকারা। কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, প্রথমে উচ্চ মাধ্যমিকের টেস্টে অকৃতকার্যরা ঘেরাও শুরু করেন। পরে দেখা যায়, অভিভাবক এমনকী বাইরের লোকজনও স্কুল-চত্বরে ঢুকে চেঁচামেচি করতে থাকে। বিরোধী দলনেতা সূর্যকান্ত মিশ্র বলেছেন, “শুনেছি, ছাত্রীদের ঘেরাওয়ের পিছনে এক কাউন্সিলর আছেন।” শিক্ষামন্ত্রী অবশ্য রাজনৈতিক মদতের অভিযোগ খারিজ করে দিয়েছেন।
এ দিন সকালে স্কুল কর্তৃপক্ষের সমর্থনেও স্কুলের কিছু প্রাক্তন ছাত্রী জড়ো হন। বিক্ষোভকারী ছাত্রীদের সঙ্গে এক সময় তাঁদের হাতাহাতি হয় বলেও অভিযোগ। বেলা বারোটার পরে স্কুলে পৌঁছন উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের সচিব এবং উপসচিব (পরীক্ষা)। তাঁরা প্রথমে শিক্ষিকাদের সঙ্গে এবং পরে অকৃতকার্য ছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলেন। বাগুইআটির অন্নদাসুন্দরী বালিকা বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অবশ্য এত ঝামেলার মধ্যেই যাননি। বিক্ষোভের মুখে পড়ে তাঁরা উচ্চ মাধ্যমিকের টেস্টে ফেল করা ১৮ ছাত্রীকেই পাশ করিয়ে দিয়েছেন।
 
 
 


First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.