ধোঁয়াশা ডাক্তারের সুইসাইড নোটে
বাম জমানায় হাসপাতালের ‘ভিতর আর বাইরের চাপ’
বাম-আমলে সরকারি হাসপাতালে ‘ভিতর এবং বাইরের’ কী কী ‘চাপ’ নিয়ে এক জন চিকিৎসককে কাজ করতে হত, নিজের সুইসাইড নোটে দাবি করে গিয়েছেন মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসক বিক্রম সাহা। সাত পাতার ওই সুইসাইড নোটই নয়, ‘ফেসবুক’-এর বন্ধুদের জন্যও প্রায় একই মর্মে ‘পোস্ট’ করা পাঁচ পাতার নোটও লিখে গিয়েছেন তিনি। বাম-জমানা কেটে যাওয়ার এক বছর পরে ওই চিকিৎসক কেন এই পদক্ষেপ করলেন তা নিয়ে ধন্দ দেখা দিয়েছে।
চিকিৎসকের পরিবার ও পুলিশ সূত্রে খবর, গত ৮ জুন রাতে মেদিনীপুর শহরের কেরানিতলার ভাড়াবাড়িতে বিক্রমবাবু বেশি মাত্রায় ‘ইনসুলিন’ ইঞ্জেকশন নেন। তাঁকে প্রথমে মেদিনীপুর মেডিক্যাল এবং পরে কলকাতায় একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। বুধবার ভোরে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়।
অতিরিক্ত ‘ইনসুলিন’ নেওয়াতেই এই মৃত্যু বলে প্রাথমিক তদন্তের পরে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। বিক্রমবাবুর স্ত্রী শালিনীদেবী শুক্রবার মেদিনীপুর কোতয়ালি থানায় স্বামীর মৃত্যুর তদন্ত চেয়ে এফআইআর করেছেন। তদন্ত শুরুও করেছে পুলিশ। ওই চিকিৎসকের অভিযোগ নিয়ে তোলপাড় হয়েছে স্বাস্থ্য ভবনেও। তবে স্বাস্থ্য-কর্তাদের বক্তব্য, পুলিশ তদন্ত শুরু করায় এই মুহূর্তে এ ব্যাপারে তাঁরা কিছু বলবেন না।
২০০৯ সাল থেকে হাসপাতালে যাচ্ছিলেন না মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক বিক্রমবাবু। বেতনও পাচ্ছিলেন না। ওই চিকিৎসকের দাবি অনুযায়ী, ‘পরিস্থিতি’র জন্য ‘দায়ী’ সরকারি হাসপাতালে (তাঁর কর্মক্ষেত্র) তৈরি হওয়া ‘ভিতর এবং বাইরের নানা চাপ’। হাসপাতালের বিভিন্ন ‘সমস্যা’র কথা জানিয়ে ওই চিকিৎসক একাধিক চিঠিও লিখেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী, রাজ্যপাল ও মানবাধিকার কমিশনকে। মুখ্যমন্ত্রীর দফতর থেকে তদন্তেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
কী সেই ‘চাপ’? পুলিশ সূত্রে খবর, প্রতিটি চিঠি, সুইসাইড নোট এবং ‘ফেসবুক’-এর নোটে বিক্রমবাবু সিপিএম সমর্থিত চিকিৎসক সংগঠন, মেদিনীপুর মেডিক্যালের বেশ কয়েকজন চিকিৎসক, স্বাস্থ্য-কর্তা ও রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছেন। ‘ফেসবুক’-এর নোট এবং সুইসাইড নোট পড়ে তদন্তকারীদের ধারণা, মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছিলেন ওই চিকিৎসক।
কিন্তু গত এক বছর রাজ্যে ক্ষমতায় রয়েছে তৃণমূল নেতৃত্বাধীন সরকার। সিপিএম সমর্থিত চিকিৎসক সংগঠন ও চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে বিক্রমবাবু এখন কেন ‘চরম পথ’ বেছে নিলেন প্রশ্ন উঠেছে তা নিয়ে। তৃণমূল-প্রভাবিত চিকিৎসক সংগঠন ‘প্রোগ্রেসিভ সার্ভিস ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন’ জানাচ্ছে, বিক্রমবাবু তাঁদের সংগঠনের কাছে কখনও কোনও অভিযোগ করেননি। আবার সিপিএম-প্রভাবিত চিকিৎসক সংগঠন ‘অ্যাসোসিয়েশন অফ হেলথ সার্ভিসেস ডক্টরস’-এর তরফে বলা হয়েছে, “২০০৯ সালে চিকিৎসায় গাফিলতির একটি ঘটনার পর থেকে বিক্রমবাবু হাসপাতালে যাননি। ওঁর অভিযোগ জেনে আমরা বিস্মিত। আমরা এর সঙ্গে কোনও ভাবে জড়িত নই।”
স্বাস্থ্য দফতর ও মেদিনীপুর মেডিক্যাল সূত্রের খবর, ২০০৯ সালে মেদিনীপুর হাসপাতালেই এক রোগীর চিকিৎসাকে কেন্দ্র করে রোগীর বাড়ির লোকের সঙ্গে বিক্রমবাবুর ‘হাতাহাতি’ হয়। তিনি আহতও হন। তার পর থেকেই তিনি হাসপাতালে যেতেন না। কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন, ওয়ার্ডে ডিউটি করতে পারবেন না। শুধু ‘প্রাইভেট প্র্যাক্টিস’ করতেন আর ছুটি বাড়ানোর জন্য হাসপাতালের অধ্যক্ষকে চিঠি দিতেন। প্রতিটি চিঠির বয়ানও এক, ‘শারীরিক ও মানসিক সমস্যার জন্য কাজে যোগ দিতে পারছি না, তাই ছুটি মঞ্জুর হোক’।
যে নোট তিনি ‘ফেসবুক’-এ ‘পোস্ট’ করেছেন তাতে এক জায়গায় লেখা রয়েছে, “আমাকে মানসিক, আর্থিক এবং পেশাগত ভাবে হেনস্থা করা হয়েছে। তার পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। আমার সমস্যার কথা অধ্যক্ষকে বার বার জানিয়েও ফল হয়নি।” যে অধ্যক্ষের সময় থেকে বিক্রমবাবু ছুটি নিতে শুরু করেন, সেই অনুপ রায় এখন উত্তরবঙ্গ মেডিক্যালের অধ্যক্ষ।
তাঁর দাবি, “প্রথম থেকেই বিক্রমবাবুর মানসিক সমস্যা ছিল বলে হাসপাতালের সকলেরই মনে হত। টানা ছুটি নিয়ে নেওয়ায় স্বাস্থ্য দফতরের নির্দেশে ওঁর বেতন বন্ধ করতে বাধ্য হই। অনেক বুঝিয়েও ওঁকে কাজে ফেরাতে পারিনি। আর কিছু বলার নেই।” বর্তমান অধ্যক্ষ শুদ্ধদন বটব্যালের বক্তব্য, “আমিও ওঁকে অনেকবার কাজে যোগ দেওয়ার জন্য বুঝিয়েছি। কাজ হয়নি।”
স্বাস্থ্য দফতর সূত্রের খবর, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে অবিযোগের চিঠি পাঠানোর পরে বিক্রমবাবুর অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয় মেদিনীপুর মেডিক্যাল কর্তৃপক্ষকে। মাস দু’য়েক আগে পাঁচ চিকিৎসককে নিয়ে তদন্ত-কমিটিও তৈরি হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, “তদন্ত কমিটির রিপোর্টে দেখা যায়, উনি হাসপাতালে কাজ করতে ভয় পেতেন। কোনও একটা ভয় চেপে বসেছিল। মানসিক রোগাক্রান্তও হয়ে পড়েছিলেন। ওঁকে এসএসকেএম-এ চিকিৎসার পরামর্শও দেওয়া হয়েছিল।”
এ বিষয়ে টেলিফোনে জানতে চাওয়া হলে বিক্রমবাবুর স্ত্রী শালিনীদেবী বলেন, “ওঁর সুইসাইড নোট আমার কাছে আছে। তাতে কিছু ডাক্তারের নাম আছে। এফআইআরে সব জানিয়েছি। আরও অনেক কিছু বলার আছে। পরে সব জানাব।”



First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.