আবির-আবেগ জুড়ল মিরিটি ও জঙ্গিপুরকে
‘কোনও টেনশন নিও না’বুধবারই শান্তিনিকেতনে ফোন করে দাদাকে আশ্বস্ত করেছিলেন।
‘টেনশন’ কিন্তু ছিলই। দাদার ছিল। ছিল গ্রামের বাড়িতে। উদ্বেগে ছিলেন গ্রামের লোকজনও। রাজধানীর রাজনীতির দড়ি টানাটানিতে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছিল বই কমছিল না। কংগ্রেস নেতা-কর্মীরা তো বটেই, গ্রামের মানুষেরও আশঙ্কা ছিল, তৃণমূলের ‘চাপে’ প্রণব মুখোপাধ্যায়কে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী করা থেকে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব সরে আসবেন না তো!
শুক্রবার বিকেলে আমূল বদলে গেল ছবিটা। টিভিতে সনিয়া গাঁধীর ঘোষণা শেষ হতেই আবেগে-উচ্ছ্বাসে ভাসল মিরিটি। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীর গ্রাম।
উচ্ছ্বাসের এমন ছবি অবশ্য বীরভূমের এই এলাকার মানুষ আগেও দেখেছেন। বিশেষত, প্রণববাবু যে-বার (২০০৪) জঙ্গিপুর লোকসভা কেন্দ্র থেকে প্রথমবার সাংসদ নির্বাচিত হন, সে দিনও মিরিটি, কীর্ণাহার, ব্রাহ্মণপাড়া, বলরামপুরপরের পর গ্রামের মানুষ ভিড় করেছিলেন মিরিটির মুখোপাধ্যায় বাড়িতে। প্রণববাবুর বাড়ির দেখভালের দায়িত্বে থাকা লাভপুর পঞ্চায়েত সমিতির কংগ্রেস সদস্য, মিরিটিরই বাসিন্দা গৌতম সরকার কিন্তু বললেন, “এত দিনের সব আবেগ ছাপিয়ে গিয়েছে আজকের এই উচ্ছ্বাস।”
রাষ্ট্রপতি পদে প্রণববাবুর নাম ঘোষণার পর মিরিটি উচ্ছ্বাস।
ছবি তুলেছেন সোমনাথ মুস্তাফি।
মিরিটিতে যখন উচ্ছ্বাস, জঙ্গিপুর তখন স্মৃতিমেদুর।
মধ্যমা দিয়ে নাকের উপরে নেমে আসা চশমাটা ঈষৎ ঠেলে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার দু’নম্বর সদস্য যখন জানতে চেয়েছিলেন “পোস্তর বড়া আর আছে নাকি?”, তখন দরজার কাছে কাঁচুমাচু মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা হকচকিয়ে গিয়েছিলেন। প্রশ্নকর্তার পাত জুড়ে এক মুঠো ভাতের উপরে তখন ছড়িয়ে ঘন মুগ ডাল। থালায় অন্য পদ বলতে একটা পটল ভাজা। জঙ্গিপুরে সদ্য ভাড়া নেওয়া দোতলা বাড়ির রাঁধুনি জগন্নাথ দাস বলছেন, “ভাঁড়ারে যে আরও দু’টো ভাজা রয়েছে, তা বেমালুম ভুলে গিয়েছি! দেশের অর্থমন্ত্রী একটা পোস্তর বড়া চাইতেই মাথাটা গুলিয়ে গিয়েছিল যে!” তড়িঘড়ি বড়া এনে দিতে সে দিন বেজায় খুশি হয়েছিলেন প্রণববাবু। জগন্নাথেরও মন ভরে গিয়েছিল।
প্রণববাবুর রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার খবরে জগন্নাথ বলছিলেন, “কোনও বায়না নেই, খান তো শুধু সামান্য এক মুঠো ভাত, মুগের ডাল আর পোস্তর বড়া। মাঝে মধ্যে পাবদা বা বাচা মাছের পাতলা ঝোল। এই সামান্য রান্নাটুকুই মন ঢেলে করতাম।”
মুর্শিদাবাদের এই প্রান্তিক এলাকা থেকে জনতার রায়ে নির্বাচিত হওয়ার পরে প্রায় ফি শনিবারই নিজের সংসদীয় এলাকায় আসেন প্রণববাবু। এ দিনের খবরে সব্বাইকে মিষ্টি খাইয়েছেন প্রণববাবুর নির্বাচনী এজেন্ট পুষ্পল দাস। “ভাবী রাষ্ট্রপতিকে জঙ্গিপুরের আনাচ কানাচ ঘুরিয়ে দেখিয়েছি, উনি আমার কাছে এলাকার খবরাখবর জেনে নিচ্ছেন, এই স্মৃতিগুলো নিয়েই আমি বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারব।”বলছেন পুষ্পলবাবু। রঘুনাথগঞ্জের ম্যাকেঞ্জি রোডে অমল ঘোষের ভাড়া বাড়ির দোতলার ঘরে পা দিয়েই টেবিলে ফাইলটা রাখার ফাঁকে প্রণববাবু জেনে নিতেন, “কী হে, সুবেদ বাড়ির খবর সব ভাল তো?” সুবেদ মণ্ডল। এই শহরে অর্থমন্ত্রীর ‘লোকাল গাইড’।
রাষ্ট্রপতি পদে প্রণববাবুর নাম ঘোষণার পর জঙ্গিপুরে উচ্ছ্বাস।
ছবি তুলেছেন অর্কপ্রভ চট্টোপাধ্যায়।
বললেন, “খুব ইচ্ছে ছিল এখানে নিজস্ব আস্তানা করার। আমরা জমি খুঁজে দিলাম। দেউলিয়া এলাকায় নতুন বাড়ির কাজও শুরু হয়েছে। তবে আর কি সে বাড়িতে আসবেন?” বড্ড বিষন্ন শোনায়।
মিরিটিও অপেক্ষায় রয়েছে তার ভূমিপুত্রের। এই গ্রামেই যে জন্ম। লাগোয়া কীর্ণাহারে প্রাথমিক শিক্ষা। পরের ধাপ কীর্ণাহারের শিবচন্দ্র হাইস্কুল। এর পরে সিউড়ির বিদ্যাসাগর কলেজ।
বীরভূমের প্রতি তাই প্রণববাবুর নাড়ির টান! সাধে কী আর প্রতি বছর দুর্গাপুজোর সময় ছুটে আসেন গ্রামের বাড়িতে। নিজেই বসেন পুজোয়।
গত তিন দিন ধরে তাই প্রণববাবুর প্রার্থীপদ চূড়ান্ত হওয়ার প্রার্থনায় কীর্ণাহার লাগোয়া জুবুটিয়া জপেশ্বর শিবমন্দিরে অর্থমন্ত্রীর কাট-আউট টাঙিয়ে হোম-যজ্ঞ-পুজোয় মেতে উঠেছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পুরোহিত উৎপল চক্রবর্তী, সনাতন চক্রবর্তীর কথায়, “নাম চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত আমরা পুজোপাঠ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।”
এ দিন বিকেলে অর্থমন্ত্রীর বাড়ির সামনে গিয়ে দেখা গেল, লাল-সবুজ আবিরে পরস্পরকে ভরিয়ে দিচ্ছেন গ্রামের মানুষ। চলছে মিষ্টিমুখ। আনন্দে নাচছেনও অনেকে। সেখানে ছেলে কাঁখে বধূ লাকি ঘোষ, বনিতা ঘোষদের পাশাপাশি সামিল তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র ঋতম সরকার, উদিত বাগদিরাও। তারা বলে, “এর পর আর রাষ্ট্রপতির নাম আমাদের আর মুখস্থ রাখতে হবে না!”
এক সময় প্রণববাবুর খেলার সাথী, গ্রামেরই বৃদ্ধ ধনপতি চৌধুরী, কিরীটীমোহন ঘোষরা বললেন, “বিভিন্ন সময়ে আত্মীয়স্বজন, নাতি-নাতনিদের কাছে আমাদের এই খেলার সঙ্গীর গল্প করেছি। রাষ্ট্রপতি হলে তো বারবার গল্প বলতে হবে।”
শান্তিনিকেতনের প্রবীণ আশ্রমিক, প্রণববাবুর দাদা পীযূষ মুখোপাধ্যায়ের প্রতিক্রিয়া, “শুধু দাদা হিসাবে নয়, এক জন সাধারণ নাগরিক হিসাবে বলতে পারি, ভারতীয় সংসদীয় রাজনীতিতে প্রণব যোগ্যতায় কারও চেয়ে কম নয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গেরই কিছু বাঙালি রাজনীতিক ওকে যে ভাবে খাটো করার চেষ্টা করেছেন, তাতে আমি অত্যন্ত মর্মাহত।” তাঁর কথায়, “প্রণব বুধবারই ফোন করে জানিয়েছিল, ‘টেনশন নিও না। সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে।’ তবে এই মুহূর্তে এই খবরে সব থেকে খুশি হতেন আমাদের বড়দা, প্রয়াত অমিয় মুখোপাধ্যায়। কারণ, প্রণব-সহ আমাদের জীবনে এগিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তাঁর বড় ভূমিকা ছিল।” বীরভূমের সাঁইথিয়াতেও এ দিন কংগ্রেস নেতা-কর্মীরা রাস্তায় নেমে উৎসব করেছেন। আবির খেলার সঙ্গে চলেছে বাজি ফাটানো, মিষ্টিমুখ।
আর কীর্ণাহারের বাড়িতে বসে প্রণববাবুর ৮২ বছরের দিদি অন্নপূর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায় বলছিলেন, “শুধু আমার ভাই হিসাবেই নয়, প্রত্যন্ত গ্রাম মিরিটির ছেলে দেশের রাষ্ট্রপতি হলে, এক জন সাধারণ নাগরিক হিসাবে গর্বিত হব। আসলে সব ভাল যার, শেষ ভাল!”



First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.