পক্ষে বঙ্গ সিপিএম
প্রণবকে সমর্থন নিয়ে উভয়সঙ্কটে বামেরা
ংগ্রেসের সঙ্গে কতটা দূরত্ব বজায় রাখা হবে, কতটাই বা সুসম্পর্ক রেখে চলা হবে, চিরাচরিত সেই প্রশ্নে ফের দ্বিধাবিভক্ত বাম শিবির!
এত দিন বাম নেতাদের অবস্থান ছিল, আগে কংগ্রেস তথা ইউপিএ রাষ্ট্রপতি পদে নিজেদের প্রার্থী ঘোষণা করুক। তার পর বামেরা অবস্থান জানাবে। কিন্তু শুক্রবার ইউপিএ প্রণব মুখোপাধ্যায়ের নাম চূড়ান্ত করে ফেলার পরেও সিপিএম তথা বাম শিবির এই বিষয়ে কোনও ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেনি। প্রধানমন্ত্রী নিজে এ দিন সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ কারাট, সীতারাম ইয়েচুরি, সিপিআইয়ের এ বি বর্ধনকে টেলিফোন করে প্রণবকে সমর্থনের জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। কিন্তু কারাট-বর্ধন তাঁকে জানান, চার বাম দলের নেতারা ২১ জুন দিল্লিতে বৈঠকে বসবেন। সেখানে আলোচনার পরেই তাঁরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। কারাট এখন চেন্নাইয়ে। সেখানে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেছেন, “বাম দলের বৈঠকের আগে কোনও মন্তব্য করব না। প্রধানমন্ত্রীকেও জানিয়েছি যে, আমরা আলোচনা করে অবস্থান ঠিক করব।”
সিপিএমের এখন কৌশল, আরও কিছু দিন অপেক্ষা করে তার পরে নিজেদের অবস্থান জানানো। সেই সঙ্গে বিজেপি তথা এনডিএ কী করছে, তা-ও দেখতে চাইছেন বাম নেতৃত্ব। বাম সূত্রের বক্তব্য, প্রধানমন্ত্রী এ দিন বিজেপি
শহরে এসএফআই-এর
একটি অনুষ্ঠানে প্রাক্তন
মুখ্যমন্ত্রী। —নিজস্ব চিত্র
নেতাদেরও টেলিফোন করে অনুরোধ জানিয়েছেন। তাঁরাও যদি প্রণবকেই সমর্থনের সিদ্ধান্ত নেন, তবে বামেদের আর প্রয়োজনই পড়বে না। একান্তই প্রণববাবুর ভোট কম পড়লে তাঁকে সমর্থনের কথা ভাবা হবে। কিন্তু অন্য অ-কংগ্রেসি, অ-বিজেপি দলগুলি কী করছে, বিশেষ করে নবীন-জয়ললিতা সাংমাকেই সমর্থন করছেন কি না, তা-ও দেখতে চাইছেন বামেরা। সিপিএমের এক পলিটব্যুরো সদস্যের কথায়, “রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে পুরো ছবিটা এখনও স্পষ্ট নয়। আমরা তাড়াহুড়ো করতে যাব কেন?”
সিপিএম তথা বামেদের অবস্থান নির্ণয়ে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ ভূমিকা থাকছে পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং আলিমুদ্দিনের নেতাদের। কলকাতায় এ দিন এসএফআইয়ের একটি অনুষ্ঠানে বুদ্ধবাবু বলেন, “প্রণববাবুর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। চার বাম দলের বৈঠক হবে। দেখি কী হয়।” আলিমুদ্দিনে বৃহস্পতিবার বুদ্ধবাবু ও বিমান বসুকে ফোন করে প্রণববাবু সমর্থন চাওয়ার পরে সিপিএমের রাজ্য নেতৃত্ব প্রাথমিক ভাবে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছেন। এ রাজ্য থেকে কেন্দ্রীয় কমিটি এবং রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর অধিকাংশ সদস্যই প্রণববাবুকে সমর্থনের পক্ষে। বৃহস্পতিবার রাতেই কারাটের সঙ্গে কথা হয় বুদ্ধবাবুর। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তখনই কারাটকে জানান, রাজ্য সিপিএম রাষ্ট্রপতি পদে প্রণববাবুকে সমর্থনের পক্ষে। তার অন্যতম কারণ, এর সঙ্গে ‘বাঙালি-আবেগ’ যুক্ত। তার থেকেও বড় কথা, যে ভাবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রণববাবুর বিরোধিতা করছেন, তাতে বামেরা প্রণববাবুকে সমর্থন করলে তাদের ‘রাজনৈতিক লাভ’ হওয়ার সম্ভাবনা। এতে তৃণমূলের সঙ্গে কংগ্রেসের বিরোধও বাড়বে।
ঠিক এই মনোভাবই উঠে এসেছে এ দিন বিধানসভায় বাম পরিষদীয় দলের বৈঠকে। সেখানে আরএসপি-র এক বর্ষীয়ান বিধায়ক তথা প্রাক্তন মন্ত্রী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রসঙ্গ তোলেন। সেই সূত্রেই বাম শরিক ফরওয়ার্ড ব্লকের এক বিধায়ক বলেন, মুখ্যমন্ত্রী মমতা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে পরিস্থিতি এমন জায়গায় নিয়ে গিয়েছেন, তাতে তাঁর সমর্থিত প্রার্থী জিতে গেলে বামেদের রাজনৈতিক অবস্থান আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। তাঁকে সমর্থন জানান সিপিএম-সহ অন্যান্য শরিক দলের বেশ কিছু বিধায়ক। অর্থাৎ ঘুরিয়ে প্রণববাবুর জয় (তখনও অবশ্য তাঁর নাম ঘোষিত হয়নি) ‘নিশ্চিত’ করার পক্ষেই মত দেন তাঁরা। বিরোধী দলনেতা সূর্যকান্ত মিশ্র আশ্বস্ত করেন, তাঁদের এই মনোভাবের কথা তিনি চার বাম দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন।
পশ্চিমবঙ্গ থেকে জোরালো মত থাকলেও ইউপিএ প্রার্থীকে কেন সমর্থন করা হবে, তা নিয়ে বাম শিবিরের টানাপোড়েন অবশ্য কাটেনি। রাষ্ট্রপতি-পদে কংগ্রেসের প্রার্থীকে সমর্থন না-করার পক্ষেই ফের মত দিয়েছেন প্রবীণ সিপিআই নেতা বর্ধন। এই বিষয়ে সিপিআইয়ের কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য গুরুদাস দাশগুপ্ত যা বলেছিলেন, তা দলের মত নয় বলে মন্তব্য করেছিলেন রাজ্য সম্পাদক মঞ্জুকুমার মজুমদার। কিন্তু এ দিন আনন্দবাজারকে পাঠানো এক বিবৃতিতে বর্ধন মঞ্জুবাবুর ওই মন্তব্যকে ‘ভ্রান্ত ও অপ্রয়োজনীয়’ বলে অভিহিত করেছেন। বিবৃতিতে বর্ধন বলেছেন, ‘মেদিনীপুরে গত ১০ জুন দলের একটি সভায় আমিও এই কথাই বলেছিলাম যে, এমন প্রার্থীকে আমরা সমর্থন করতে পারি না, যিনি নব্য উদারনীতি এবং জনবিরোধী আর্থিক নীতির স্থপতি’। চার বাম দলের বৈঠক হয়ে যাওয়ার পরে সিপিআই তাদের দলীয় অবস্থান চূড়ান্ত করবে ২৫ জুন দিল্লিতে জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠকে।
বর্ধনেরা যে যুক্তি দিচ্ছেন, তার সঙ্গে সিপিএমের পলিটব্যুরো ও কেন্দ্রীয় কমিটির একাংশও এক মত। বুদ্ধবাবুর সঙ্গে সিপিআইয়ের এক কেন্দ্রীয় নেতার প্রাথমিক ভাবে মত-বিনিময়ও হয়েছে। কিন্তু বঙ্গের নেতাদের একটা বড় অংশ প্রণবকে সমর্থনের পক্ষে, তাও মাথায় রাখছেন কারাটরা। সিপিএমের অভ্যন্তরের এই ‘ফাটল’ আরও বাড়িয়েছে প্রণববাবুর টেলিফোন। কলকাতায় বুদ্ধবাবু, বিমানবাবুকে ফোন করে তিনি বৃহস্পতিবারই রাষ্ট্রপতি পদে ইউপিএ-র প্রার্থীকে সমর্থনের অনুরোধ জানান। তার পরেই প্রশ্ন উঠেছে, প্রণব কেন দিল্লির এ কে গোপালন ভবনকে এড়িয়ে গিয়ে বুদ্ধদেব-বিমানকে সরাসরি ফোন করলেন? তা কি শুধুই বাঙালি বলে? প্রণব বাঙালি বলেই যদি তাঁকে সমর্থন করতে হয়, তা হলে নিজেদের ‘জাতীয় দল’ বলার যৌক্তিকতা কোথায়?
আলিমুদ্দিনের তরফে এ কে গোপালন ভবনকে বোঝানোর চেষ্টা চলছে, প্রণবকে সমর্থন করা মানেই কংগ্রেসের সঙ্গে ‘নীতিগত সমঝোতা’ নয়। কিন্তু কংগ্রেসের সঙ্গে তৃণমূলের জোট ভাঙলে বামেদেরই লাভ। তা ছাড়া, প্রণবের সঙ্গে ‘ব্যক্তিগত সম্পর্কে’র খাতিরেও অনেকে তাঁকে সমর্থনের পক্ষে। ইয়েচুরি এখন বেইরুটে। তিনি ফিরলে বাম দলগুলির বৈঠকের আগে পলিটব্যুরোর দিল্লিতে উপস্থিত সদস্যদের মধ্যেও এ বিষয়ে আলোচনা করা হবে।
এখনও পর্যন্ত কারাট-বর্ধনদের আলোচনায় সাংমার কথাও এসেছে। সিপিআই নেতারা বলছেন, নবীন পট্টনায়েক ও জয়ললিতা যদি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে সাংমাকেই সমর্থন করেন এবং সাংমা প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে না-দাঁড়ান, তা হলে তাঁকে সমর্থন করার জন্যও বামেদের মধ্যে চাপ আসবে। সাংমা উত্তর-পূর্ব ভারতের আদিবাসী নেতা। তাঁকে বাদ দিয়ে কেন প্রণবকে সমর্থন করা হল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তা হলে কি খোদ প্রধানমন্ত্রী-প্রণবের অনুরোধ ফিরিয়ে দেবেন বাম নেতারা? তাঁদের বক্তব্য, বামেরা প্রথম থেকেই বলে আসছে যে, রাষ্ট্রপতি পদে যত বেশি সম্ভব সর্বসম্মতি হওয়া প্রয়োজন। এই বিষয়ে ইউপিএ-কেই উদ্যোগী হতে হবে। কিন্তু প্রথমে নাম ঘোষণা করে দিয়ে তার পরে সমর্থন চাওয়াকে কোনও ভাবেই ঐকমত্য গড়ে তোলার চেষ্টা বলা যায় না।

(তথ্য: প্রসূন আচার্য, সন্দীপন চক্রবর্তী ও প্রেমাংশু চৌধুরী)


First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.