রবিবাসরীয় প্রবন্ধ ১...
বঙ্কু ঠাকুর
বি ঠাকুর আর ‘বিবেকানন্দ’ ঠাকুরের ‘শ্রাদ্ধ’ শতবর্ষের হুল্লোড়ে বাঙালি আর এক ঠাকুরের কথা বেমালুম ভুলে মেরে দিল! একটা হাতে-গরম ছুটির দিন গোল্লায় গেল! গত ২৭ জুন এই ঠাকুর তাঁর ১৭৫তম জন্মশতবর্ষ পার করে ১৭৬ বছরে পা দিলেন। ‘রবি ঠাকুর’-এর মতো ইনিও ‘বঙ্কু ঠাকুর’ হয়ে উঠতে পারতেন। স্রেফ নিজের দোষে ‘বঙ্কিমচন্দ্র’ হয়েই তাঁকে সন্তুষ্ট থাকতে হল।
বাঙালি বঙ্কিমকে ভয় পায়। ‘ওরেব্বাবা! বোং-কিম! পড়তে গেলে দাঁত খুলে যাবে যে!’ এই দাঁত খুলে যাওয়ার কথাটা নির্জলা মিথ্যে। বঙ্কিমের ভাষায় তৎসম শব্দের বাহুল্য তাঁর গদ্যকে ধ্রুপদী এবং গম্ভীর করেছে বটে, কিন্তু সংস্কৃত শব্দের বাড়াবাড়িতে গদ্য মোটেই কঠিন হয় না, গদ্য কঠিন হয় ক্রিয়াপদের তির্যক ব্যবহারে। আজকের বাঙালি কমলকুমার মজুমদারের নামই শোনেনি বলে কঠিন গদ্যের সমস্ত দোষ বঙ্কিমের ঘাড়ে চাপিয়ে দায় সেরেছে।
উইলিয়াম কেরী-রামমোহন-বিদ্যাসাগর মিলে যে ভাষাকে ক্রমাগত গড়েপিটে কাজ চালানোর ভাষা ও পাঠ্যপুস্তক রচনার ভাষায় পরিণত করলেন, বঙ্কিম সেই ভাষাকে ব্যবহার করে বাংলার প্রথম উপন্যাস রচনা করে বসলেন। ব্যাপারটা শুনতে সহজ লাগলেও, সে যুগে ব্যাপারটা যাচ্ছেতাই রকমের কঠিন। এসএমএস বা চ্যাট ল্যাংগোয়েজে পিএইচডি-র থিসিস পেপার লেখার মতো কঠিন। যখন বঙ্কিম ‘দুর্গেশনন্দিনী’, ‘কপালকুণ্ডলা’ লিখছেন, তখন বাংলার গদ্যভাষা অপরিণত। সে ভাষায় বিধবা বিবাহ কেন প্রচলিত হওয়া দরকার এটা বোঝানো গেলেও, প্রেমাস্পদের জন্য হৃদয়ের আকুলি-বিকুলি মোটেই প্রকাশ করা যায় না। কারণটা সহজ, বাংলার শব্দভাণ্ডার তখন ভীষণ সীমিত।
বাঙালি তখনও সংস্কৃত আর ফারসি শেখে। আমবাঙালি তখনও জানে না ইংরেজি জিনিসটা খায় না মাথায় দেয়। তাই বাংলায় যে সব শব্দ নেই, সংস্কৃত থেকে সেই শব্দগুলো ধার করলে লোকে সহজে বুঝবে। ‘আকাশে মেঘাড়ম্বর কারণ রাত্রি প্রদোষকালেই ঘনান্ধতমোময়ী হইল’— আজকের বাঙালির কাছে হিব্রু-ল্যাটিন গোছের কিছু একটা ঠেকলেও তখনকার পাঠকের কাছে প্রায় জলবৎতরলং। এই তৎসম শব্দজড়িত বাংলা গদ্য সে যুগে অভিজাত গদ্যেরই মর্যাদা পেয়েছিল। আলালি বাংলা হুতোমি বাংলায় এমনিতে কথা বললেও সাহিত্যে বঙ্কিমচন্দ্র ছাড়া বাঙালির গতি ছিল না। বাংলা ভাষায় প্রথম উপন্যাস রচনার অর্ধেক শতাব্দী পেরিয়ে রবীন্দ্রনাথ কথাসাহিত্যিক হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছেন। এই বিদ্যাসাগরী বাংলা ও রাবীন্দ্রিক বাংলার অর্ধ-শতক ব্যবধান বঙ্কিমচন্দ্রই তাঁর উপন্যাস আর প্রবন্ধ দিয়ে ভরাট করে রেখেছেন।
ঔপন্যাসিক বঙ্কিম আর প্রাবন্ধিক বঙ্কিমের বিস্তর ফারাক। এর জন্য দায়ী ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকাটি। ঔপন্যাসিক ও ম্যাজিস্ট্রেট পরিচয়ে যিনি দিব্যি জীবন কাটিয়ে দিতে পারতেন, তিনি আবার বাঙালি জাতির সাংস্কৃতিক খিদে মেটানোর দায় নিজের কাঁধে তুলে নিলেন। এবং তাঁর সর্বত্রগামী পাণ্ডিত্যকে কাজে লাগালেন। আউগুস্ত কোঁত-এর দর্শন নিয়ে প্রবন্ধ লিখলেন! জন স্টুয়ার্ট মিল-এর দর্শন নিয়ে প্রবন্ধ লিখলেন! পশ্চিমি বাণিজ্যতত্ত্বকে কী ভাবে ভারতের প্রেক্ষিতে প্রয়োগ করা যায় তা নিয়ে প্রবন্ধ লিখলেন! ‘বঙ্গদর্শন’-এর প্রবন্ধগুলির মধ্যে বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধগুলি পড়লে চমকে উঠতে হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থার সেই ভোরবেলার দিকে, সেই প্রায়ান্ধকার সময়ে পৃথিবীর কোন দেশের কোন বিজ্ঞানী কী আবিষ্কার করলেন, পৃথিবীর কোন প্রান্তে বিজ্ঞানের গবেষণা কত দূর এগিয়ে গেল— তার সব খবর বঙ্কিম সংগ্রহ করতেন, এবং সুললিত সহজ বাংলায় পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতেন। ‘বিজ্ঞানরহস্য’ তাঁর সেই অসামান্য ঔৎসুক্য, আত্তীকরণ ও পরিশ্রমের সাক্ষ্য বহন করছে। যদিও সে পরিশ্রম বৃথা গেছে। কারণ, তিনি তো আর জানতেন না, এই জাতি আর কয়েক প্রজন্ম পরেই কূপমণ্ডূকতার শ্রেষ্ঠ আসন লবে! সে জাতি মুখে বলবে ‘আম্মো গ্লোবাল নাগরিক’, আর কাজে শুধু আন্তর্জাতিক ফিল্মস্টারের কেচ্ছা চাখবে ও সেই বিষয়ে রসালো মন্তব্য চালবে!
বঙ্কিমের স্যাটায়ারের কপালেও একই উপেক্ষা জুটেছে। ‘কমলাকান্তের দপ্তর’ কিংবা ‘লোকরহস্য’ আজ কেউ পোঁছে না। আসলে বাঙালি তত ক্ষণ পর্যন্তই স্যাটায়ারকে গ্রহণ করে, যত ক্ষণ তা রাত্রের টিভি শো-র কদর্য তরজায় আটকে থাকে। ব্যঙ্গকে যে বাঙালি কুৎসা বা অপমান বলেই ঠাওরায়, স্ল্যাপস্টিক ছাড়া যে হাসতে শেখেনি, ভাঁড়ামি আর রসিকতার ফারাক যে বোঝে না, তার পক্ষে ‘কমলাকান্ত’কে বোঝা অসম্ভব।
তবুও, আজকের যুগে দাঁড়িয়ে বঙ্কিম কঠিন। এবং কঠিন বলেই বঙ্কিম মৃত। এর প্রধান কারণ, বঙ্কিম সাহিত্যজীবনের প্রথমার্ধে শুধু তৎসম শব্দ ব্যবহার করেই ক্ষান্ত হননি। সংস্কৃত ভাষার গাম্ভীর্য বাংলা ভাষায় আমদানি করতে তিনি বাক্যে সংস্কৃতের সন্ধিকে ব্যবহার করেছেন দস্তুরমত। ‘নববারিসমাগমপ্রফুল্ল’, ‘মদনমদোন্মাদহলাহলকলসীতুল্য’— এই শব্দবন্ধগুলি আসলে সংস্কৃত সন্ধিতে জোড়া দেওয়া কতগুলো তৎসম শব্দ দিয়ে তৈরি। এই শব্দবন্ধগুলোর প্রয়োগ সে যুগে যথাযথ হলেও, আজকের ঝরঝরে মেদবর্জিত বাংলা ভাষায় অভ্যস্ত পাঠক এর পাঠোদ্ধার করতে থমকাতে বাধ্য। যদিও এর পেছনে বঙ্কিমের যুক্তি ছিল। অবাধ্য ঘোড়াকে ট্রেনিং দিয়ে সুশিক্ষিত করে তুলতে হয়। সে জন্যই লাগামের প্রয়োজন। পরে, ঘোড়া বাধ্য হয়ে গেলে, সওয়ারি লাগাম ছাড়াও দিব্যি চড়তে পারে। প্রথম দিকে বঙ্কিমের রচনায় তাই এত লাগামের ছড়াছড়ি। পরে আর তার প্রয়োজন হয়নি। ‘কপালকুণ্ডলা’র ভাষার চেয়ে ‘দেবী চৌধুরাণী’র ভাষা তাই অনেক সহজ, স্বচ্ছন্দ, ঝরঝরে। তার একটা কারণ, তত দিনে বঙ্কিম ‘বঙ্গদর্শন’ সম্পাদনা করতে করতে সহজ, সুললিত গদ্য রপ্ত করে ফেলেছেন এবং নিজ দক্ষতার শীর্ষবিন্দুতে বিরাজ করছেন।
এর পর বাংলায় রবীন্দ্রনাথের আবির্ভাব ও সিংহাসনারোহণ, স্বাধীনতা সংগ্রাম, বিশ্বযুদ্ধ, দাঙ্গা, দেশভাগ— পর পর ঘটে গেল। সবক’টা ঘটনার অভিঘাতই বাংলা ভাষাকে বিভিন্ন ভাবে বদলে দিয়েছে। ফলে বঙ্কিমের গুরুত্বও কমে গেল অনেকখানি। তাঁর ব্যবহৃত ভাষা সময়ের নিয়মেই সরে দাঁড়াল। অবশ্য কেউ বলতেই পারেন, ‘সরে দাঁড়ায়নি’, বরং ‘মিশে গিয়েছে’। রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে এই ধারণাটা আরও সহজে বোঝা যাবে। কল্লোলীয়রা যখন রবীন্দ্রনাথকে অতিক্রম করতে চাইছেন, তখন রবীন্দ্রনাথকে পড়ে ও অনুধাবন করে তাঁদের চিনতে হয়েছে কোনটা রবীন্দ্রনাথের পথ। এ বার তাঁরা অন্য পথ দিয়ে হাঁটা শুরু করেছেন। কিন্তু এর পরে, ‘কৃত্তিবাস’-এর সময়ে, সুনীল-শক্তি-শরৎকুমার -সন্দীপনদের কিন্তু কল্লোলের মতো রবীন্দ্র-অনুধাবন করে রবীন্দ্রভিন্ন পথটা খুঁজে বের করতে হয়নি। কারণ, কৃত্তিবাসের যুগে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য আর দুরতিক্রম্য বাধা নয়, বাঙালিয়ানা তত দিনে রাবীন্দ্রিকতাকে শুষে নিয়েছে তার মধ্যে। বঙ্কিমের ক্ষেত্রেও সে কথা পুরোপুরি খাটে। আজকের গদ্য, সে উপন্যাস হোক বা প্রবন্ধ, বাঙালি বঙ্কিমের ভাষায় লেখে না, লিখতে পারে না, লেখার দরকারও নেই। কিন্তু গদ্যের যে কাঠামোয় বাঙালি আজও প্রবন্ধ বা উপন্যাস লেখে, সে কাঠামো বঙ্কিমচন্দ্রেরই হাতে গড়া। এত দিন ধরে বঙ্কিমের কাঠামো বাংলা গদ্যে এমন ভাবে মিশে গিয়েছে, তাকে আর আলাদা করে বঙ্কিমের বলে চেনার জো নেই।
কিন্তু যেটুকু বঙ্কিমচন্দ্রকে চিনতে পারি এখনও, তাঁর ভাষা দিয়ে, সে ভাষা আজ মৃত, অচল, পরিত্যক্ত। এসএমএস, টুইটার, ফেসবুক, ব্লগ— এ সব জায়গায় যে বাংলা লেখা হচ্ছে, সেই ভাষায় বঙ্কিমের প্রভাব কোথাও, এতটুকুও বেঁচে নেই। বইপ্রিয় বাঙালি তো বিলুপ্তপ্রায়, এনডেঞ্জার্ড শ্রেণি— সেই বইমুখো বাঙালিও অবসর কাটাতে বেশির ভাগ সময় তুলে নেয় শারদীয় উপন্যাস, কিছু ক্ষেত্রে লিটল ম্যাগ। এই বইগুলোর ভাষায় কোথাও বঙ্কিম নেই। সেই ভাষায় না আছে সংস্কৃতের দৌরাত্ম্য, না আছে উৎকট সন্ধি।
সময় বদলে গেল, আর বঙ্কিম হয়ে গেলেন ব্রাত্যজন— অঙ্কটা এত সহজ নয়। আমাদের শিক্ষা যত বেশি উপার্জনমুখী হয়েছে, সে সাবেক কেরানিগিরি হোক বা হালের কর্পোরেট সেক্টর— পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ইংরেজি শেখার প্রবণতা। পাশাপাশি সমগ্র দেশের নিরিখে বাংলার আর্থ-রাজনৈতিক অবস্থানও দায়ী, যে কারণে বাংলা ভাষাটাকে ক্রমে বাঙালিই দুচ্ছাই করতে লাগল। এখন তো এক বর্ণ বাংলা না জেনেও পশ্চিমবঙ্গে দিব্যি জীবন কাটিয়ে দেওয়া যায়। বাংলা ভাষার প্রতি এই অবজ্ঞাটা আরও চোখে লাগে রাস্তাঘাটে বেরিয়ে দোকানের সাইনবোর্ডগুলো পড়তে পড়তে চললে। প্রতি পাঁচটি সাইনবোর্ডের চারটিতেই বাংলা বানানে ভুল পাওয়া যায়, তুলনায় ইংরেজি বানানে ভুল অনেক কম। (আশ্চর্যজনক ভাবে কলকাতার বুকেই এই বানান ভুলের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। গঙ্গাসাগরের রুদ্রনগরের বাজারে দোকানের সাইনবোর্ডে ইংরেজি শব্দই নেই প্রায়, কিন্তু প্রতিটি বাংলা বানান শুদ্ধ। সেখানে ইংরেজির গুরুত্বটা সে রকম নেই বলেই হয়তো বাংলা ভাষাটার প্রতি, সেখানকার বাসিন্দাদের দায়বদ্ধতা অনেক অনেক বেশি। কিন্তু হায়, কে না জানে, সংস্কৃতি আসলে ‘রাজধানীর সংস্কৃতি’!) তা হলে, যেখানে গোটা বাংলা ভাষাটাই বাঙালির কাছে ক্রমশ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে, সেখানে বাংলা ভাষার প্রাচীন সংস্কৃতগন্ধী ঔপন্যাসিকের (হোন না তিনি ‘সাহিত্যসম্রাট’) ভাষা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে— আশ্চর্য কী!
হালফিলের সুপারহিট যে-জিনিস, সেই এসএমএস-এর বাংলা ভাষা সবচেয়ে আজব চিড়িয়া। একে তো রোমান হরফ, তায় আবার তার নিজস্ব কোড আছে। এইখানে এসে বঙ্কিমি ভাষা ডাহা ফেল। বাঙালি প্রেমিক দুটো কারণে প্রেমিকাকে বঙ্কিমি ভাষায় মেসেজ করে না। এক, প্রেমিকাকে ‘ললিত-লবঙ্গলতিকা-পরিশীলন-কোমল-মলয়-সমীরে’ সম্বোধন করলে আদ্ধেক ক্যারেকটার সম্বোধনেই গচ্চা যাবে। দুই, প্রথম বার পাঠানোর পর প্রেমিকা না বুঝে কোনও মতে একটা স্মাইলি পাঠাবে। তাতে উৎসাহিত হয়ে একই ভুল দ্বিতীয় বার করলে প্রেমিকা বিরক্ত হয়ে সিম পালটে ফেলবে। প্রেম আগে না বঙ্কিম আগে? সে ঝক্কি পোয়ানোর চাইতে ‘লাভ ইউ জান’ পাঠানো ঢের সুবিধার। সম্পক্কো ‘স্টেবল’ থাকবে।
কিছু প্রাজ্ঞ ব্যক্তি আজকের দিনে বঙ্কিমের জনপ্রিয়তা হ্রাসের কারণ দর্শাতে ভাষা ছাড়াও আরও দু-একটা কারণের কথা উল্লেখ করেন বটে। তার কতকগুলো ভারী ভারী নামও আছে। যেমন ‘নব্যহিন্দুত্ববাদিতা’ কিংবা বিধবাবিবাহ-বাল্যবিবাহ ইত্যাদি নিয়ে বঙ্কিমের প্রাচীনপন্থী মনোভাব, ‘শিল্পী বঙ্কিম ও সমাজসংস্কারক নীতিপরায়ণ বঙ্কিমের নিরন্তর সংঘাত’ ইত্যাদি ইত্যাদি। এগুলো নেহাত বাজে কথা। বরং এগুলোর জন্যই বঙ্কিম আজও জনপ্রিয় থাকতে পারতেন। আজকের বাঙালির প্রগতিশীলতার সবটুকু বোঝা যায় রবিবারের পাত্র-পাত্রী বিজ্ঞাপন দেখলেই। বঙ্কিমের তাও শিল্প আর নীতির সংঘাত ছিল, বাঙালি বঙ্কিমেরও আগের যুগে পড়ে রয়েছে, সংঘাত কাকে বলে জানেই না।
বঙ্কিম কি তা হলে আর কেউ পড়ে না? আলবাত পড়ে। বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করতে গেলে, ছাড়ান নেই। গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো আছে হালের মাল্টিপ্ল চয়েস নেট-সেট পরীক্ষার গেরো। সেখানে রোহিণী কত বার বারুণী পুকুরের ঘাটে গিয়েছিল আর প্রসন্ন গোয়ালিনী দুধে কত পার্সেন্ট জল মেশাত স-অ-ব মুখস্থ রাখতে হয়। এই সব দিনরাত মুখস্থ করতে হলে মাথা ঠিক রাখা মুশকিল। তাই বঙ্কিমচন্দ্র ধীরে ধীরে বাংলা সাহিত্যের ছোট্ট একটা গোষ্ঠীর কাছে ‘বঙ্কু ঠাকুর’ হয়ে ওঠেন। হুমায়ুন আজাদের মতো কেউ যখন বলে বসেন, বঙ্কিমচন্দ্র আসলে প্রাচীন যুগের নারীবিদ্বেষী ঋষি মনুর মতোই এক আধুনিক ঋষি— সেই গোষ্ঠীর লোকজন রে রে করে মারতে আসেন। আসাই উচিত। অন্তত একটা গোষ্ঠীর কাছে বঙ্কিমচন্দ্র ‘বঙ্কু ঠাকুর’ রূপে পূজিত হন। সেটাই সান্ত্বনা।
কিন্তু সাধারণ বাঙালির কাছে বিশ্বকবি ‘রবি ঠাকুর’ হয়ে উঠলেও ‘সাহিত্যসম্রাট’ কেন ‘বঙ্কু ঠাকুর’ হয়ে উঠলেন না? কারণ, রবীন্দ্রনাথ আমবাঙালির কাছে নোবেল পুরস্কারের গ্ল্যামারটুকু বাদ দিলেও আদৃত ও পূজিত প্রধানত তাঁর গানের জন্য (মূলত প্রেমের গান, এবং হাল আমলে গিটার-ড্রামের সঙ্গে গাওয়া যায় এমন গান), আবৃত্তিযোগ্য ও সহজপাচ্য-সহজবোধ্য গুটিকয়েক কবিতার জন্য, এবং গুটিকয়েক ছোট গল্পের (প্রথম পর্যায়ের সহজ গল্প আর যেগুলো সিনেমা হয়েছে) জন্য। এগুলো না থাকলে দশটা নোবেল পেলেও তিনি ‘রবি ঠাকুর’ হতেন না। বাঙালি ‘চার অধ্যায়’-এর রচয়িতা রবীন্দ্রনাথকে চেনেই না, ‘সাহিত্য’-র নামই শোনেনি। এর পাশাপাশি বঙ্কিম প্রথম জীবনে কয়েকটি পদ্য লিখলেও আজীবন যুক্তিনিষ্ঠ ও শ্লেষাত্মক প্রবন্ধ এবং ধ্রুপদী উপন্যাস রচনায় নিজেকে নিয়োগ করেছেন। ফলে লোকরঞ্জক-সহজপাচ্য কোনও উপাদান তাঁর লেখায় বাঙালি খুঁজে পায়নি। তাঁর রচনার গভীরে যাওয়ার কোনও মেড-ইজি পথ নেই। বঙ্কিমের গদ্য অনুধাবন করতে পাঠককে কিছুটা প্রস্তুতি নিতে হয় বইকি! প্রস্তুতি মানেই পরিশ্রম। পরিশ্রম আর বাঙালি? ইউটোপিয়া।
কিন্তু বাঙালির একটু ভুল হয়ে গেল না কি? আর একটু আগে যদি খেয়াল পড়ত, বন্দে মাতরম্ ছাড়াও দু-একখান কবিতাকে সুর-টুর দিয়ে বঙ্কিমগীতি বলে চালালেই দু-চার দিন ছুটি পাওয়া যেত। ইস, মিস হয়ে গেল! সেই চব্বিশ বছর পর দুশো বছর পূর্তি। তদ্দিনে অবশ্য সুর জিনিসটাই ছুটি নিতে পারে, ‘কপালকুণ্ডলা’ র্যাপ করে চালালেই বা ধরছে কে!

ছবি: সুমন চৌধুরী


First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.