বাড়ছে অপরাধ, গরু পাচার রুখতে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি
খুন, ডাকাতি, চুরি, কেপমারি গত কয়েক মাসে একের পর এক অপরাধ হয়েই চলেছে বনগাঁয়। অথচ, বেশির ভাগ ঘটনাতেই দুষ্কৃতীরা এখনও অধরা। গত শুক্রবার ভরসন্ধ্যায় বনগাঁ শহরের বাটার মোড়ে সোনার দোকানে ডাকাতি এবং তার পরে দুষ্কৃতীরা যে ভাবে জনবহুল ওই এলাকায় বোমা-গুলি ছুড়ে পালায়, সেই আতঙ্ক এখনও কাটেনি সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে। ওই ঘটনায় পুলিশ নদিয়ার তাহেরপুর থেকে শনিবার রাতে এক জনকে গ্রেফতার করলেও বাকি দুষ্কৃতীদের খোঁজ মেলেনি এখনও। যাবতীয় দুষ্কর্মের পিছনে সাধারণ মানুষ যেমন পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ তুলেছেন, তেমনই সরব হয়েছেন দিনের পর দিন সীমান্ত দিয়ে হয়ে চলা গরু পাচার রুখতে। আইনশৃঙ্খলার অবনতির জন্য তাঁরা গরু পাচারকেই দায়ী করেছেন। রাজনৈতিক দলের একাংশেরও গরু পাচারে মদত আছে বলে স্থানীয় মানুষের অভিযোগ।
মহকুমার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গত শনিবারই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে বৈঠক করেন মহকুমাশাসক অভিজিৎ ভট্টাচার্য। সেই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ডিআইজি (পিআর) অনিল কুমার। ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা তাঁর কাছে পাচার এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে ক্ষোভ উগরে দেন। বনগাঁর প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক গোপাল শেঠ আগেই গরু পাচারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের আর্জি জানিয়ে চিঠি দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। এ দিন সেই চিঠির প্রতিলিপি ডিআইজি-র কাছে তুলে দেন। ডিআইজি উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, “গরু পাচার বন্ধ করতে সীমান্তে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর করা হচ্ছে।” বনগাঁ উত্তর কেন্দ্রের তৃণমূল বিধায়ক বিশ্বজিৎ দাস জানিয়েছেন, অন্যান্য রাজ্য থেকে গরু যখনই এ রাজ্যে ঢুকছে, তখনই যাতে ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সে জন্য ডিজি-র কাছে আর্জি জানানো হয়েছে।
কিন্তু সাধারণ মানুষ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের একাংশ মনে করছেন, পুলিশ ‘সক্রিয়’ না হলে গরু পাচার পুরোপুরি বন্ধ হওয়া সম্ভব নয়। এবং গরু পাচার চলতে থাকলে অন্যান্য দুষ্কর্মও চলতে থাকবে সমান তালে। কেউ কেউ আবার গরু পাচারকারীদের সঙ্গে পুলিশের একাংশের যোগসাজশের অভিযোগও তুলছেন। তাঁদের মতে, নদিয়া-সহ আশপাশের কয়েকটি জেলা এবং বাংলাদেশ থেকে দুষ্কৃতীরা ঢুকে স্থানীয় দুষ্কৃতীদের সহযোগিতায় দুষ্কর্ম করছে।
বনগাঁ শহর কংগ্রেসের সভাপতি কৃষ্ণপদ চন্দের অভিযোগ, “পুলিশকে প্রায়ই গরু পাচারকারীদের কাছ থেকে তোলা তুলতে দেখা যায়। সাধারণ মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়ার সময় কোথায় তাদের?” সিপিএমের উত্তর ২৪ পরগনা জেলা কমিটির সদস্য, বনগাঁর বাসিন্দা দুলাল মণ্ডল বলেন, “এখানে অপরাধমূলক কাজ বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ গরু পাচার। দুষ্কৃতীদের দৌরাত্ম্য এখন লাগামছাড়া।” জেলা তৃণমূলের কার্যকরী সভাপতি রতন ঘোষ বলেন, “পুলিশেরই উচিত পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া।” বনগাঁর কেন্দ্রীয় ব্যবসায়ী সমিতির সম্পাদক শিবপ্রসাদ বসু বলেন, “যা চলছে, তাতে আমরা ব্যবসায়ীরা খুবই আতঙ্কিত। নয়ের দশকের ভয়াবহ পরিস্থিতি যেন ফিরে এসেছে। দুষ্কৃতীদের সঙ্গে পুলিশের একাংশ সরাসরি যুক্ত।”
শুক্রবার বাটার মোড়ের সোনার দোকানে ডাকাতির পরে পুলিশ সুপার চম্পক ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে দুষ্কৃতীদের খোঁজে তল্লাশি চালানো হয়। দুষ্কৃতীদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবিতে শনিবার সকালে এক ঘণ্টা বাটার মোড় অবরোধ করে কংগ্রেস। সন্ধ্যায় মিছিল করেন ব্যবসায়ীরা। দু’টি ক্ষেত্রেই গরু পাচারের বিষয়টিও উঠে আসে।
পুলিশ সুপার চম্পক ভট্টাচার্য বলেন, “পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক তল্লাশি চলছে। গত তিন মাসে প্রচুর গরু আটক করা হয়েছে। একই সঙ্গে বহু পাচারকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পাচার পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে বলছি না। তবে, উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। সাম্প্রতিক সব অপরাধেরই তদন্ত চলছে।” পুলিশের একাংশের সঙ্গে পাচারকারীদের আঁতাতের অভিযোগ প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার বলেন, “ওই ধরনের অভিযোগ পেলেই কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” অপরাধ রোখার ক্ষেত্রে পুলিশের একাংশ পরিকাঠামো-সমস্যার কথা তুলেছেন।
বনগাঁ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে গরু পাচার অবশ্য নতুন কোনও ঘটনা নয়। দিনের পর দিন পঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, হরিয়ানা থেকে গরু নিয়ে এসে বনগাঁ সীমান্ত দিয়ে পাচার করা হয় বলে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে। পাশাপাশি, রমরমিয়ে চলে নিষিদ্ধ কাশির ওষুধ পাচার বা বেআইনি ভাবে মানুষ পারাপারও। তবে, গরু পাচারকারীদের জন্যই সবচেয়ে আতঙ্কে থাকেন সীমান্তবর্তী এলাকার গ্রামবাসীরা। বিস্তীর্ণ খেতের উপর দিয়ে গরু নিয়ে যাওয়ার ফলে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে দেখেও চাষিরা প্রতিবাদ করতে সাহস পান না। কেননা, কেউ কেউ আগে প্রতিবাদ করে পাচারকারীদের হাতে আক্রান্ত হয়েছেন। পুলিশ বা বিএসএফ জওয়ানদের উপরে পাচারকারীদের হামলার উদাহরণও রয়েছে।

বনগাঁয় সাম্প্রতিক অপরাধ
২৫ মে: সন্ধ্যায় বাটার মোড়ে সোনার দোকানে ডাকাতি। বোমায় জখম ৯। এখনও পর্যন্ত ধৃত ১।
১৮ মে: পেট্রাপোলে ট্রাক টার্মিনাসের সামনে দিনেদুপুরে গুলি করে খুন। কেউ ধরা পড়েনি।
৫ এপ্রিল: গাইঘাটার আংড়াইলে কয়েকটি বাড়িতে চুরি। কেউ ধরা পড়েনি।
২২ মার্চ: বাড়ি ফেরার সময়ে বক্সি পল্লিতে গুলিবিদ্ধ ব্যবসায়ী। কেউ ধরা পড়েনি।
৮ মার্চ: বনগাঁর সুভাষ নগরে বাড়িতে চড়াও হয়ে যুবককে খুনের চেষ্টা। কেউ ধরা পড়েনি।
৬ মার্চ: গোপালনগরের চামটা গ্রামে বাড়িতে চড়াও হয়ে যুবককে খুনের চেষ্টা। কেউ ধরা পড়েনি।
২১ নভেম্বর: বনগাঁর জয়ন্তীপুরে মুদ্রা বিনিময় কারবারিকে গুলি করে খুন। ধৃত ১।
২০ সেপ্টেম্বর: ১ নম্বর রেলগেটের কাছে দুষ্কৃতীদের গুলিতে পুলিশকর্মী নিহত। কেউ ধরা পড়েনি।



First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.