সম্পাদক সমীপেষু...
এখনও সমাজ মেয়েদের পায়ে বেড়ি পরিয়ে রেখেছে
মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার ‘মাদার’স ডে’ উপলক্ষে শ্রাবণী রায় আকিলার ‘দুনিয়ার মা এক হও’ (১২-৫) শীর্ষক প্রতিবেদনটির প্রসঙ্গে কয়েকটি কথা বলতে চাই। এখনও আমাদের সমাজে মায়েদের স্থান বাবাদের পাশে নয়, অনেক পিছনে। বহু ক্ষেত্রে বুদ্ধি, মেধা, জ্ঞানচর্চা ও রাজনীতিতে পুরুষের সমকক্ষ হওয়া সত্ত্বেও কুসংস্কারাচ্ছন্ন অনুশাসন মাতৃজাতিকে অবদমিত করে রাখে। নারী প্রগতি, স্ত্রী স্বাধীনতার নামে পুরুষের আসর সরগরম নিছক ধাপ্পাবাজি ছাড়া কিছু নয়। স্বাধীনোত্তর প্রায় ৬৫ বছরেও বন্ধ করা যায়নি আগ্রাসী মনোভাবাপন্ন সতীদাহর পুনরুজ্জীবন, দেবদাসী প্রথা, বধূহত্যা, কন্যা ভ্রুণ হত্যা, নারী নির্যাতন, গৌরীদান, ব্যাপক হারে পণ দেওয়া-নেওয়া এবং লাগাতার ধর্ষণ। এই সময়ের ক্রমবিবর্তন দেখলে বোঝা যায়, সরেজমিন পর্যবেক্ষণের ও নারীমুখী চেতনার অভাবে মাতৃজাতি সম্পর্কীয় সরকারি নীতি নির্ণয় ও পরিকাঠামো সৃষ্টি বাস্তবের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন। হিন্দু কোড বিল, সমকাজে সমবেতন, গর্ভপাত সিদ্ধ, পঞ্চায়েত ও পুরসভার মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণ, মুসলিম মহিলা বিল ইত্যাদি নীল-নকশার দৌলতে দীর্ঘ দিনের অবহেলিতরা বৃহত্তর আর্থ-সামাজিক, ধর্মীয় সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে স্বমহিমায় অভিষিক্ত হয়েছেন, এমন ভাবনা বাতুলতা।
মেয়েদের সামাজিক মর্যাদা অপহরণের পালা শুরু শৈশব কাল থেকে। কম বয়সেই তার হাঁটাচলা, গতিবিধি ও কথা বলার ভঙ্গির উপর কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি হয়ে যায়। কঠোর সামাজিক বিধিনিষেধ এবং কঠিন শৃঙ্খলার চাপে অসহায় বালিকা-কিশোরীরা নতজানু হতে বাধ্য হয়। সাবালিকা অবস্থাতেও অভিভাবকহীনা একা এক জনের পক্ষে পশ্চিমবঙ্গের মতো সংস্কৃতিমনস্ক, প্রাগ্রসর, সচেতন বলে পরিচিত গর্বিত রাজ্যে ঘরভাড়া পাওয়া এখনও স্বপ্নের অতীত। ভাবতে অবাক লাগে, শুধু মাত্র মেয়ে হওয়ার অপরাধে বঙ্গসংস্কৃতির পীঠস্থান তথা বাঙালির প্রিয় শহরে এক শিল্পীর আঁকা ছবি প্রকাশ্যে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়েছে। তাই সামাজিক অধিকার অপব্যবহার করছে বলে মহিলাদের দিকে যাঁরা সরাসরি অভিযোগের আঙুল তোলেন, সেই পুরুষদের কাছে জিজ্ঞাস্য অধিকার সদ্ব্যবহার-অপব্যবহারের মাপকাঠি নির্ধারণের ক্ষমতা আপনারা পেলেন কোথা থেকে? তা ছাড়া, পৌরুষের স্বেচ্ছা-আরোপিত খবরদারি মহিলারা মেনে নেবেন কেন? সমানাধিকার তো দূর অস্ত, নারীর স্বাধীন চিন্তা-ভাবনাতেও আপত্তি পুরুষদের।
পুরুষশাসিত সমাজে ধর্মীয় আচরণও পিতৃতন্ত্রের প্রতীক। পিতৃতন্ত্রের মধ্যমণিরা ধর্মীয় অনুশাসনের স্থপতি ও অনুঘটক হওয়ায় তাঁদের নির্দেশে ধর্মীয় নীতিকার ও শাস্ত্রকাররা সর্বক্ষেত্রেই মাতৃতান্ত্রিক সমাজের মর্যাদাকর রীতিনীতি তথা নারী-পুরুষ সমপালিত ধর্মীয় আচারাদি অন্যায় ও অনৈতিক উপায়ে বাতিল অথবা বদল করে, নারীর ওপর একচ্ছত্র খবরদারি ব্যবস্থা কায়েম রাখার বন্দোবস্ত পাকাপোক্ত করে দিয়েছেন। নারীর আশা-আকাঙ্ক্ষাকে পদদলিত করে তার অধিকার ও মর্যাদা পুরোপুরি খর্ব করতে উঠেপড়ে লেগেছেন ধর্মীয় নেতারা। এঁদের সর্বনাশা আচরণের দরুন উদ্ভূত ঘৃণা, বিদ্বেষ আর হলাহল মিশ্রিত আধিব্যাধির অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মধ্যযুগীয় বর্বরতা পুনরুজ্জীবিত হয়ে কুসংস্কারাচ্ছন্ন অনুশাসনের জন্ম দিতে চাইছে। নারীর উপর অন্যায় অভিপ্রায় চাপিয়ে দিয়ে তা শিরোধার্য করতে বাধ্য করার মধ্যে নিহিত আছে পুরুষের একাধিপত্য বজায় রাখার কৌশল।
মাতৃজাতির কল্যাণের নামে একটি জাতীয় কমিশন গঠন করেছে কেন্দ্রের সমাজকলাণ মন্ত্রক। আপাতদৃষ্টিতে কমিশন দ্বারা অবহেলিতা ও বঞ্চিতা দেশের অর্ধেক বাসিন্দাকে বাকি অর্ধেকের কাছাকাছি পৌঁছে দেওয়ার বাসনা ব্যক্ত হলেও, যে যে বৈষম্যের দরুন এক জন নারীকে এক জন পুরুষের সঙ্গে অসম পাঞ্জা কষতে বাধ্য করা হয়, তা দূর না-করে, বাধ্যবাধকতার বাঁধন শক্ত না-করে, ঘড়ির কাঁটা তড়িঘড়ি এগিয়ে দিয়ে সমাজের খোলনলচে বদলের চিন্তা আত্মতুষ্টির সমপর্যায়ভুক্ত।
মারাত্মক বিপজ্জনক পরিস্থিতির সম্মুখীন মাতৃজাতির নিজেদের নীরোগ, তাজা ও উদ্যোগী রাখা ভীষণ কঠিন কাজ। কারণ, পুরুষশাসিত সমাজের মেরুদণ্ড বাঁকতে বাঁকতে এখন এমন বেঁকে গেছে যে, ক্রমাগত হাতুড়ির ঘা মেরে তা সোজা না-করলে পুরুষের শাসনদণ্ডের তীব্র চাপের কাছে নতিস্বীকার ভিন্ন গত্যন্তর নেই নারীর। কেবল গ্রাসাচ্ছাদনের বন্দোবস্ত করার জন্য নয়, সামাজিক বিধিনিষেধ অগ্রাহ্য তথা অমান্য, নিরাপত্তাবোধের অভাব ও তজ্জনিত ভীতির বাতাবরণ অপসারণ, দৈনন্দিন শোষণ, বঞ্চনা ও অপমানের অবসান এবং সর্বোপরি নিজেদের অধিকার ও সম্মান আদায়ের জন্য দীর্ঘস্থায়ী লাগাতার লড়াইয়ের মহড়া শুরু করতে মাতৃজাতিকে একজোট হয়ে নতুন উদ্যমে উজ্জীবিত ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। একই সঙ্গে খেয়াল রাখতে হবে, বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ শুরুতেই শেষ করতে কায়েমি স্বার্থের পৃষ্ঠপোষকরা সদা তৎপর। শৃঙ্খল ভেঙে মুক্তির জন্য মহিলাদের সর্বাগ্রে পুরুষের ছত্রচ্ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে স্বশাসিত হওয়ার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতেই হবে। স্বাধিকার অর্জনের জন্য বিপক্ষের ভরসায় না-থেকে সামাজিক ব্যাধি নিরাময়ের দায় নিজেদেরই বহন করতে হবে। অসহনীয় অবস্থার আমূল পরিবর্তন না-হওয়া অবধি সংগ্রামে খামতি দিলে পরিস্থিতি যে তিমিরে, সেই তিমিরেই পড়ে থাকবে।


First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.