দায়িত্ব সেই পূর্ণেন্দুকেই
সিন্ডিকেটে থাকলেই বহিষ্কার, কড়া মুখ্যমন্ত্রী
রাজারহাটের সিন্ডিকেট-কাণ্ডে হস্তক্ষেপ করে ‘কড়া ব্যবস্থা’ নিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বৃহস্পতিবার মহাকরণে দলের দুই মন্ত্রী পূর্ণেন্দু বসু এবং জ্যোতিপ্রিয় মল্লিককে ডেকে পাঠিয়ে দীর্ঘ বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানে ছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক মুকুল রায়ও।
বৈঠকে দলের সর্বময় নেত্রী তথা রাজ্যের মুখ্য প্রশাসক মমতা যা বলেছেন,
তার নির্যাস
• তৃণমূলের পরিচিত কোনও মুখ এই সিন্ডিকেট ব্যবসায় জড়িত থাকতে পারবেন না। সিন্ডিকেট বা প্রোমোটিংয়ের ব্যবসা ব্যক্তিগত ভাবে কেউ করতেই পারেন। কিন্তু সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দল ছেড়ে দিয়ে তা করতে হবে।
• এই ধরনের কোনও নেতা সিন্ডিকেটে জড়িত থাকলে তাঁকে এখনই সরাসরি দল থেকে বহিষ্কার করা হবে।
• রাজারহাট-কাণ্ডে যারা জড়িত, তাদের ধাপে ধাপে দল থেকে বিচ্ছিন্ন করা হবে।
• ওই বিষয়ে দলীয় পদাধিকারী এবং মন্ত্রীদের প্রকাশ্যে কোনও মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
সম্প্রতি রাজারহাট নিয়ে পূর্ণেন্দুবাবুর বিরুদ্ধে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে নালিশ করেছিলেন তৃণমূল কর্মীদের একাংশ। তা সত্ত্বেও এ দিন কিন্তু রাজারহাট-গোপালপুর বিধানসভা কমিটি গঠনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তাঁকেই। এলাকার বিধায়ক হিসেবে তিনি ওই বিধানসভা কেন্দ্রেরও চেয়ারম্যান। ফলে সেখানকার যাবতীয় সাংগঠনিক বিষয় পূর্ণেন্দুবাবুই দেখভাল করবেন। ঘটনাচক্রে, সিন্ডিকেট-ব্যবসার জেরে যে কেষ্টপুরে তৃণমূলের নেতা স্বপন মণ্ডল খুনের ঘটনা ঘটেছে, সেটা তাঁর কেন্দ্রেরই অন্তর্গত। আর খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক উত্তর ২৪ পরগনা জেলার দলীয় ‘পযর্বেক্ষক’।
বৈঠকের পরে মুকুলবাবু ওই বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি। তিনি শুধু বলেছেন, “রাজারহাটের ব্যাপারে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে পূর্ণেন্দু বসু ও দোলা সেনের নাম জড়ানো হচ্ছে। ওই ঘটনা পুরোপুরি সমাজবিরোধীদের ব্যাপার।” মন্তব্য এড়িয়ে গিয়েছেন পূর্ণেন্দুবাবুও। আর জ্যোতিপ্রিয় বলেন, “ধান কেনা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক ছিল।”
স্বপন-হত্যার পরেই রাজারহাটে সিন্ডিকেট-ব্যবসা এবং তাকে কেন্দ্র করে শাসক দলের ভিতরের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে চলে আসে। জেলা তৃণমূলের একাংশ যেমন পূর্ণেন্দুবাবুর বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে থাকেন, তেমনই পূর্ণেন্দু-শিবির থেকেও পাল্টা অভিযোগ তোলা হয়। অবস্থা আয়ত্তের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে হস্তক্ষেপ করেন দলনেত্রী স্বয়ং। তৃণমূল সূত্রের খবর, রাজারহাটে সিন্ডিকেট-ব্যবসাকে কেন্দ্র করে দলের একাংশ যে গোলমালে জড়িয়ে পড়ছেন, অনেক আগেই সেই খবর মুখ্যমন্ত্রীর কাছে এসে পৌঁছেছিল। মাসখানেক আগে তাই তিনি দলীয় স্তরে নির্দেশও দিয়েছিলেন, সমস্ত সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার জন্য। কিন্তু তাতেও ‘কাজের কাজ’ কিছু হয়নি। স্বপন-হত্যার পরে তাই মমতা নিজেই বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করলেন।
রাজারহাট-গোপালপুর বিধানসভা কেন্দ্রের কমিটি গঠনের দায়িত্ব পূর্ণেন্দুবাবুকে দেওয়ায় তাঁর শিবির ‘উল্লসিত’। তারা ‘স্বস্তিতে’ মুকুলবাবুর এই বিবৃতিতেও যে, ওই বিষয়ে পূর্ণেন্দু-দোলার নাম ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে’ জড়ানো হচ্ছে। কারণ, দলেরই একাংশ ওই নাম ‘জড়িয়েছিল’। তাঁর অন্যতম ‘আস্থাভাজন’ মুকুলবাবুর মারফৎ মমতা দলের সেই অংশের প্রতিও ‘বার্তা’ দিলেন বলেই পূর্ণেন্দু-শিবিরের দাবি। দলের শীর্ষনেতৃত্বের অবশ্য বক্তব্য, সাগঠনিক নির্বাচনের জন্য আড়াই মাস আগেই সমস্ত কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। এখন সেগুলি নতুন করে গঠিত হবে। পূর্ণেন্দুবাবু ওই এলাকার বিধায়ক তথা চেয়ারম্যান। ফলে স্বভাবতই তাঁর উপর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ঠিক যে ভাবে বাকি কমিটিগুলির ‘দায়িত্ব’ পাবেন সেই কেন্দ্রের দলীয় বিধায়করা। দলের এক নেতার কথায়, “এ কাজ যে একেবারেই সমাজবিরোধীদের, তা তো দলের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সৌগত রায় প্রথম দিনই বলেছিলেন। সেই কথাটাই আরও এক বার স্পষ্ট করে দেওয়া হল।”
উত্তর শহরতলিতে দলের ‘অনুগত কর্মী’ স্বপনবাবু সিন্ডিকেটের লড়াইয়ের শিকার হওয়ার পরে যে ভাবে দলের নেতা-মন্ত্রীদের নাম ওই এলাকার অশুভ চক্র এবং কোটি কোটি টাকার লেনদেনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে, তাতে ‘উদ্বিগ্ন’ তৃণমূল নেতৃত্ব। আগামী শনিবার তৃণমূল ভবনে ওই বিষয়ে একটি বৈঠক ডাকা হয়েছে। সেখানে সংশ্লিষ্ট সমস্ত নেতা, কাউন্সিলর, সংলগ্ন এলাকার বিধায়কদেরও ডাকা হয়েছে। থাকতে পারেন সংশ্লিষ্ট সাংসদরাও। এই বৈঠক থেকেই নেতাদের ‘প্রয়োজনীয় নির্দেশ’ দেওয়া হবে। আপাতত উত্তর শহরতলির প্রায় ৮০টি সিন্ডিকেটের কাদের কাদের পিছনে কোন কোন নেতার মদত রয়েছে, তার একটি তালিকা তৈরি করা হচ্ছে।
ঘটনাচক্রে, স্বপন-হত্যার পরেই পূর্ণেন্দুবাবু বলেছিলেন, “যিনি খুন হয়েছেন, তাঁর অতীতটাও দেখা জরুরি।” বস্তুত, গত রবিবার স্বপন-হত্যার পরেই মমতা পূর্ণেন্দুবাবুর সঙ্গে কথা বলেছিলেন। পূর্ণেন্দু-শিবিরের দাবি, রাজারহাট-গোপালপুরে দলের কারা সিন্ডিকেট-ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এবং সাধারণ মানুষের উপর তারা কী ধরনের ‘অত্যাচার’ করে, সে বিষয়ে অন্তত ২০টি অভিযোগ তাঁদের হাতে রয়েছে। অন্য দিকে বুধবারই মহাকরণে জ্যোতিপ্রিয় বলেছিলেন, “আমাদের লোকেরা সকলেই সাধু নাকি! অনেকেই সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত। ওই এলাকায় দলের এক-আধ জন নিজের ভাইদেরও ওই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত করেছেন!” বুধবার রাতেই জ্যোতিপ্রিয় সল্টলেকে একটি ব্যক্তিগত নৈশভোজের আয়োজন করেছিলেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ সূত্রের খবর, রাজ্য মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়া ‘সেলিব্রেট’ করতে ওই নৈশভোজের আয়োজন। সেখানে জেলাপুলিশের কিছু পদস্থ কর্তাও রাতের দিকে আসেন এবং পূর্ণেন্দু-বিরোধী কিছু কথাবার্তা হয়। সেই কথা এ দিন সকালেই পূর্ণেন্দু-শিবিরে পৌঁছোয়। যা দ্রুত পৌঁছোয় মুখ্যমন্ত্রীর কাছেও। পূর্ণেন্দুবাবুর সঙ্গে মুকুলবাবুর আগেও কথা হয়েছিল। রাজারহাটে জমি, বাড়ি বেচা-কেনা থেকে শুরু করে বাড়ি তৈরির কাঁচা মাল বিক্রি করা নিয়ে দলের এক শ্রেণির নেতা-কর্মী এলাকায় রীতিমতো ‘দুর্নীতি-রাজ’ চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছিলেন পূর্ণেন্দুবাবু। তবে বিষয়টি নিয়ে মুকুলবাবু ও পূর্ণেন্দুবাবু কেউ কোনও মন্তব্য করেননি। তৃণমূলের কাছে সব থেকে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল এটাই যে ভাবে দলের নেতা-মন্ত্রীরা বিবৃতি দেওয়া শুরু করেছিলেন, তার প্রভাব পড়ছিল দলের, বিশেষত দলনেত্রী মমতার ভাবমূর্তির উপরে। এক নেতার কথায়, “বিধানসভা ভোটে সিপিএম তথা বামফ্রন্টের শোচনীয় হারের পিছনে অন্যতম প্রধান কারণ ছিল এই স্তরের ব্যাপক দুর্নীতি। সিপিএম-জমানার শেষ দিকে এই ‘পাপেই’ এলাকার মানুষের ক্ষোভ চরমে উঠেছিল। তার প্রতিফলন ঘটে ভোটে। তৃণমূল নেতৃত্বের একাংশের বক্তব্য, গত জমানার জমা ‘পাপ’ তাঁরা সাফাই করতে তো পারেনইনি, বরং তৃণমূল-জমানার শুরু থেকে সেই ‘পাপ’ তাঁদের উপর চেপে বসছে। দ্রুত তা থেকে বেরোতেই মমতা নিজে বিষয়টি ‘হাতে নিলেন’ বলেন দলের নেতাদের বক্তব্য।
এমনই এক নেতার কথায়, “এখানে পরিস্থিতি যা হয়েছে, তাতে দলীয় নেতৃত্বের মধ্যে একটা সমন্বয় থাকা দরকার। দলের নেতাদের একাংশ যে ভাবে ব্যক্তিগত প্রভাব বৃদ্ধির প্রতিযোগিতায় নেমেছেন, তাতে দলের ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। কেউ ভাবছেন না, এখনও আমরা রাজারহাট পুরসভা দখল করতে পারিনি। দলের ভাবমূর্তি যদি তলানিতে গিয়ে ঠেকে, তবে আগামী দিনে পঞ্চায়েত ভোটেও আমাদের চরম মূল্য দিতে হবে।”
 
 
 


First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.